বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের পরেও ভিসা প্রাপ্তিতে বাড়তে থাকা বাধা তাদের পরিকল্পনাকে প্রায়শই থামিয়ে দেয়। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদনকারী ছাত্রছাত্রীরা এখন কেবল আবেদন ফরম পূরণেই নয়, ভিসা সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত দেশ ভ্রমণ এবং দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ের মুখোমুখি হচ্ছে।
ইউরোপের বেশ কিছু দেশের ভিসা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ভারতে যেতে হয়, কারণ ঐ দেশগুলোর বাংলাদেশে কোনো দূতাবাস নেই। ভারতীয় দূতাবাসে আবেদন জমা দেওয়ার পর অন্তত তিন সপ্তাহের জন্য সেখানে অবস্থান করতে হয়, যা আর্থিক ও সময়গতভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অপরিহার্য, যেখানে ভিসা পেতে ভারতীয় দূতাবাসে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী অপেক্ষা করতে হয়।
মধ্য ইউরোপের কিছু দেশের ভিসা পেতে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার ভারতে ফিরে আসতে হয়। আবেদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, ফলে ভ্রমণ ও প্রস্তুতির খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। পর্তুগাল, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ইত্যাদি দেশের দূতাবাসের অভাবে এই দেশগুলোর ভিসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতীয় দূতাবাসের বিকল্প হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের দূতাবাস থেকে কিছু দেশের ভিসা আবেদন করা সম্ভব হলেও, এই দু’টি দেশের ভিসা স্লটও সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বিকল্প দেশগুলোর জন্যও অপেক্ষা তালিকায় আটকে যায়।
জার্মানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ঢাকায় জার্মানির দূতাবাস থাকলেও শিক্ষা ভিসা সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষার সময় ২৮ মাসের কাছাকাছি। এই দীর্ঘ সময়ের কারণে শিক্ষার্থীদেরকে কমপক্ষে দুই-তিন বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রস্তুতির সময়সীমা বাড়ার ফলে অনেক ছাত্রের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও দেরিতে আবেদনকারীকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক হয়।
এইসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ের ফলে শিক্ষার বিরতি ঘটতে পারে, যা একাডেমিক রেকর্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাছাড়া, ভিসা প্রক্রিয়ার অপ্রত্যাশিত বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই তাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাদ পড়ে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ৮ অক্টোবরের একটি আলোচনায় উল্লেখ করেন, ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা শুধু প্রক্রিয়াগত নয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক চিত্রেরও প্রভাব রয়েছে। দেশের ভিসা নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি না হলে শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ সীমিত থাকবে।
শিক্ষা সংক্রান্ত পরামর্শক সংস্থা সিএসবি-র সিইও জুলফিকার আলীও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘ সময়সীমা এবং অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনা বদলে দেয় এবং অনেকেরই স্বপ্নের দেশ থেকে দূরে সরে যায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপ প্রস্তাব করা যায়। প্রথমত, ভিসা প্রক্রিয়ার সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পর্কে যতটা সম্ভব আগে থেকে তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য বিকল্প দেশগুলোর ভিসা প্রক্রিয়া তুলনা করে সবচেয়ে কম সময়সাপেক্ষ বিকল্প বেছে নেওয়া জরুরি। তৃতীয়ত, ভিসা আবেদন করার সময় আর্থিক পরিকল্পনা করে দীর্ঘমেয়াদী অপেক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। শেষমেশ, শিক্ষার্থীরা তাদের লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি শর্তাবলী এবং ভিসা নীতির পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে।
ভিসা প্রাপ্তিতে বাড়তে থাকা জটিলতা সত্ত্বেও, সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়মতো তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।



