গোপালগঞ্জের গোপালগঞ্জ‑৩ (কোটালিপাড়া‑তুঙ্গিপাড়া) আসনে বিএনপি-নির্বাচিত প্রার্থী ও জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এসএম জিলানি সম্প্রতি সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একটি সভায় নিজের প্যানজাবি খুলে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ধারাবাহিক হুমকি রয়েছে এবং কোনো সময়ে কী ঘটতে পারে তা অজানা। এই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সভায় উপস্থিত জনগণের সামনে জিলানি জ্যাকেটটি দেখিয়ে বলেন, “এটি সত্য যে আমাদের জীবনের জন্য হুমকি রয়েছে। দেখুন, আমি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরেছি। আমি জানি না কখন কী ঘটবে, তবে আমি মানুষদের সঙ্গে থাকতে এই ঝুঁকি গ্রহণ করেছি।” তার এই বক্তব্য নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্র করে জনমতকে উস্কে দেয়।
জিলানি ১৭ বছর ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তিনি নিজের রাজনৈতিক যাত্রা সম্পর্কে বলেন, “আমি ১৭ বছর ধরে এই পথে চলেছি, যদিও হুমকি কখনো কমেনি।” তার দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কার্যক্রম গোপালগঞ্জের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পায়, যেখানে এই আসনটি শীঘ্রই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদী সিট।
২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় জিলানির ওপর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরোপ করা হয়। তিনি জানিয়েছেন, “আমি নির্বাচনের সময় কারাবন্দি হয়েছি, ভোটের ফলাফল জানার সুযোগই পাইনি।” জেলাবন্দি অবস্থায় তার স্ত্রী তার পক্ষ থেকে মনোনয়ন পত্র স্বাক্ষর করে জমা দেন, তবে তখনকার প্রশাসন তার মনোনয়ন বাতিল করে দেয়। এই ঘটনা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
কোটালিপাড়া উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক আবুল বশার দরিয়া গোপালগঞ্জ‑৩কে সংবেদনশীল আসন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এই এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল।” তিনি জিলানির গাড়ি মটরসেডের ওপর পূর্বে আক্রমণের কথা তুলে ধরেন, যেখানে এক আক্রমণে একজনের মৃত্যু ঘটেছে। এছাড়া কোটালিপাড়া থানা ও ইউনো অফিসের আশপাশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা এলাকার নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
দরিয়া আরও যোগ করেন, “এই বাস্তবতা এবং জনগণ ও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জিলানি সভায় নিরাপত্তা বিষয়টি তুলে ধরেছেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে মাঠে সক্রিয় থাকতে হবে এবং একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।” তার মন্তব্য জিলানির নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পেছনের যুক্তি ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
জিলানি শেষ পর্যন্ত বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে,” এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান না হলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। তার এই বক্তব্য বর্তমান সরকারের নীতিমালা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
গোপালগঞ্জ‑৩ আসনের সংবেদনশীলতা এবং অতীতের সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে জিলানির বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিধান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে প্রার্থী ও তার দলের কর্মসূচি কীভাবে গঠন করবে, তা আসন্ন নির্বাচনী প্রচারাভিযানের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বিরোধী দলগুলো জিলানির নিরাপত্তা উদ্বেগকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে আসনের ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাস্তব সমস্যাগুলি সমাধান না হলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে, যা গোপালগঞ্জের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে।
ভবিষ্যতে গোপালগঞ্জ‑৩-এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক বিরোধের তীব্রতা কমানো এবং ভোটারদের ন্যায়সঙ্গত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যাবে। জিলানির বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের দৃশ্যটি এই চ্যালেঞ্জের প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিরাপত্তা ও জনসাধারণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।



