জার্মানির রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্ক‑ভ্যাল্টার স্টেইনমেয়ার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা ওপর সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন, যা চীনের শি জিনপিং‑এর একই রকম মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। স্টেইনমেয়ার উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বিশ্ব শৃঙ্খলাকে ক্ষয় করছে এবং তা অনিয়ন্ত্রিত দখলদারিত্বের পথে নিয়ে যেতে পারে।
৩ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ব্যাপক বিমান ও স্থল আক্রমণ চালায়। এই অপারেশনের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা। আক্রমণের পর, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর হাতে তুলে নেওয়া হয়।
মাদুরোর গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভেনেজুয়েলা সরকার ও তার সমর্থক দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করে। একই সময়ে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আধিপত্যবাদকে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। শি জিনপিং বলেন, বর্তমান বিশ্বে দেখা না যাওয়া অস্থিরতা একতরফা শক্তির অতিরিক্ত বিস্তার থেকে উদ্ভূত।
স্টেইনমেয়ার, জার্মানির অন্যতম প্রধান ইউএস মিত্র, এই মন্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব শৃঙ্খলা ভেঙে না যায় এবং নীতিহীন শক্তি স্বেচ্ছায় দখলদারিত্ব চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকতে হবে। যদিও তিনি সরাসরি ভেনেজুয়েলা আক্রমণ উল্লেখ করেননি, বিশ্লেষকরা তার মন্তব্যকে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জার্মানির সমালোচনা উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে জার্মানির অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইউএস‑ইউই সংযোগের মূল সেতু। স্টেইনমেয়ারের মন্তব্য ইউএস‑ইউই সম্পর্কের মধ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যখন ইউরোপীয় দেশগুলো মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সংবেদনশীল।
ভেনেজুয়েলা বিষয়টি চীনের জন্যও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বেইজিং দীর্ঘদিন থেকে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের সমর্থক হিসেবে অবস্থান নিয়েছে এবং মাদুরোর মুক্তি দাবি করে বহুবার প্রকাশ্য বিবৃতি জারি করেছে। শি জিনপিংয়ের মন্তব্যের সঙ্গে স্টেইনমেয়ারের সমালোচনা মিলিয়ে দেখা যায়, দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
এই সমন্বয় ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন জোটের সূচনা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতি নিয়ে সমালোচনা বাড়লে, ইউরোপীয় ও এশীয় দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন কূটনৈতিক কৌশল গড়ে তুলতে পারে। জার্মানি ও চীনের সমন্বিত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অধিকন্তু, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপের পর, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদুরোর গ্রেপ্তার পর, দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে।
জার্মানির এই মন্তব্যের ফলে ইউএস‑ইউই সম্পর্কের মধ্যে নতুন আলোচনার দরজা খুলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সমালোচনা করা জার্মানির জন্য কেবল একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি নৈতিক দায়িত্বের প্রকাশও হতে পারে।
চীনের সঙ্গে সমন্বয় জার্মানির কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে, তবে একই সঙ্গে ইউএস‑ইউই জোটের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। ভবিষ্যতে, এই দুই দেশের সমন্বিত অবস্থান কীভাবে বিকশিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনে কী প্রভাব ফেলবে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজরে থাকবে।
সংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা অভিযান এবং তার পরবর্তী আন্তর্জাতিক সমালোচনা জার্মানি ও চীনের সমন্বিত অবস্থানকে উজ্জ্বল করেছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্যের ওপর নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।



