বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংবাদিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড নীতি নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি জানিয়ে দেন যে, বর্তমান সরকারের পরিবর্তে পূর্ববর্তী সব সরকারই এই নীতির জন্য দায়ী, এবং বর্তমান প্রশাসনের হাতে এই নীতি পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই।
উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়; ইমিগ্রেশন সমস্যায় জর্জরিত বহু দেশের মধ্যে বাংলাদেশী নাগরিকদের সংখ্যা সর্বোচ্চ। তিনি উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সিস্টেম থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া মাইগ্র্যান্টদের মধ্যে বাংলাদেশীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা দেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
এছাড়া, তিনি বলেন যে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করা এই সংকটের সমাধানের মূল চাবিকাঠি। অনিয়মিত অভিবাসন নীতি দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে এবং তা পরিবর্তন করা বর্তমান সরকারের ক্ষমতার বাইরে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কোনো সরকারই মানুষের গতি-প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত ক্ষমতা রাখে না, তাই নীতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অভিবাসন নীতি সম্পর্কে তৌহিদ হোসেনও মন্তব্য করেন। তিনি জানান, প্রথম দিন থেকেই সরকার অনিয়মিত অভিবাসনের বিরোধিতা করে আসছে। তৌহিদ হোসেন একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, গ্রামাঞ্চলের একজন যুবক পর্যটক ভিসা নিয়ে কেনিয়া বা তুরস্কে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও তার আর্থিক সামর্থ্য নেই। তিনি জোর দেন যে, এই ধরনের ভ্রমণ বন্ধ না করা পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের ১৫,০০০ ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড জমা দিতে হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে এই তালিকা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল (মঙ্গলবার) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশিত হয়।
গত বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ছয়টি দেশের নাম বন্ড তালিকায় যুক্ত করে। পরবর্তীতে আরও সাতটি দেশকে এই তালিকায় যোগ করা হয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশসহ অতিরিক্ত ২৫টি দেশের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ধারাবাহিক সম্প্রসারণের ফলে ভিসা বন্ডের শর্তযুক্ত দেশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পেছনে আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছে, তবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এই নীতির পরিবর্তন বা পুনর্বিবেচনা করতে পারবে না, কারণ নীতি গঠন ও বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল।
অন্তর্বর্তী সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, অনিয়মিত অভিবাসন রোধের জন্য কঠোর নীতি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। তৌহিদ হোসেনের উদাহরণে দেখা যায়, গ্রামীণ তরুণদের ভিসা প্রাপ্তি এবং তাদের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে বড় ফাঁক রয়েছে, যা মানবিক সংকটের দিকে নিয়ে যায়।
ভিসা বন্ড নীতি এবং অনিয়মিত অভিবাসন সমস্যার সমাধান দুটোই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়। বর্তমান সরকার এই বিষয়গুলোতে কীভাবে পদক্ষেপ নেবে, তা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং অভিবাসন নীতিতে প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন না হলে, বাংলাদেশী নাগরিকদের উপর আর্থিক ও সামাজিক চাপ বাড়তে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, ভিসা বন্ড নীতি এবং অনিয়মিত অভিবাসন সমস্যার সমাধান দুটোই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ, এবং তাৎক্ষণিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নীতি সমন্বয় এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান খোঁজার সম্ভাবনা রয়েছে।



