ঢাকা, ৮ জানুয়ারি – ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল আলম, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব, কোম্পানি অপরাধ সংক্রান্ত শাস্তি বিধান পরিবর্তনের বিস্তারিত জানালেন। তিনি জানিয়ে দিলেন যে, পূর্বে কোম্পানির অপরাধে কারাদণ্ডের বিধান ছিল, যা এখন সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে এবং শুধুমাত্র জরিমানা ধার্য করা হবে। এই পরিবর্তনকে তিনি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রেস সচিবের মতে, কারাদণ্ডের অপসারণের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীরা আইনগত ঝুঁকি কমে যাওয়ায় আরও আত্মবিশ্বাসী হবে। যদিও জরিমানা একক শাস্তি হিসেবে থাকবে, তবে তার পরিমাণ ও প্রয়োগের কঠোরতা নিশ্চিত করা হবে যাতে কোম্পানিগুলো আইন মেনে চলে।
সেই দিনই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষা (সংশোধন) খসড়া ২০২৬‑এর নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬‑এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এছাড়া বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬‑এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন পায়, যদিও চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও বাকি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত “হার্ড ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন” (NDC‑৩) প্রকল্পের ভূতাপেক্ষ অনুমোদনও একই দিনে নিশ্চিত করা হয়। এই নীতি দেশের জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬‑এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্টে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে; পূর্বে সব তথ্যের সমন্বিত রেকর্ড রাখা বাধ্যতামূলক ছিল, এখন তা কেবল ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার (CII) ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এছাড়া ডেটা লোকালাইজেশন বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে, তবে ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহারে নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমির কাঠামোগত পরিবর্তনও একই দিনে ঘোষিত হয়। পূর্বে সীমিত সংখ্যক বিভাগ থাকলেও, এখন একাডেমি মোট নয়টি বিভাগে বিভক্ত হয়েছে: প্রশাসন ও অর্থ, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, পারফর্মিং আর্ট, গবেষণা ও প্রকাশনা, নিউ মিডিয়া, কালচারাল ব্র্যান্ডিং উৎসব ও প্রযোজনা, এবং সংগীত ও চারুকলা। এই বিস্তৃত কাঠামো শিল্পকলা ক্ষেত্রের বহুমুখী উন্নয়নকে সমর্থন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বোর্ডে নতুন বিধান যোগ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে একজন সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে। এই পদক্ষেপটি সাংস্কৃতিক নীতি প্রণয়নে অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্পকর্মের সমর্থন নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা হত্যার ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠলে উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতিমধ্যে পুলিশকে জানানো হয়েছে এবং তদন্ত চলমান।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আইনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনগুলোকে দুই দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। একদিকে, কারাদণ্ডের অপসারণ এবং ডেটা লোকালাইজেশন বাধা হ্রাসের ফলে বিদেশি কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে দেখবে, যা সরাসরি সরবরাহ শৃঙ্খলা, রিয়েল এস্টেট এবং সেবা খাতের বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, জরিমানা একক শাস্তি হিসেবে থাকায় কোম্পানিগুলোর সম্মতি নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তীব্র নজরদারি প্রয়োজন হবে; না হলে শাস্তির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
শিল্পকলা একাডেমির বিভাগ বৃদ্ধি এবং নৃগোষ্ঠী প্রতিনিধিত্বের নতুন বিধান সংস্কৃতি ও পর্যটন শিল্পে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। অধিক বিভাগ মানে বেশি প্রকল্প, বেশি তহবিলের চাহিদা এবং সম্ভাব্য বেসরকারি অংশীদারিত্ব। তবে একই সঙ্গে বাজেটের পুনর্বণ্টন এবং কার্যকরী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি, নতুবা অতিরিক্ত বিভাগে সম্পদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, সরকার যে আইনগত সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন চালু করেছে, তা ব্যবসা পরিবেশকে আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি, বিনিয়োগকারীর আত্মবিশ্বাস এবং শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়ার উপর।



