ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগে অনুষ্ঠিত গবেষণা সেমিনারে আজ উল্লেখযোগ্য এক দৃষ্টিকোণ উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি শক্তিশালী হলে ইনসাইডার ট্রেডিং থেকে প্রাপ্ত লাভ কমে যায়, ফলে এই অবৈধ কার্যকলাপের প্রবণতা হ্রাস পায়।
ইনসাইডার ট্রেডিং বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি কোম্পানির গোপন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে শেয়ার কেনা-বেচা করা। এই তথ্য প্রকাশের আগে বাজারে প্রকাশ না হওয়ায় লেনদেনের ফলাফল অন্য অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় অনুকূল হয়।
সেমিনারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগে আয়োজিত হয় এবং এতে আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতামত শোনা যায়। নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি ইউনিভার্সিটিতে আর্থিক হিসাবের অধ্যাপক আহসান হাবিব মূল বক্তা হিসেবে কীনোট পেপার উপস্থাপন করেন।
হাবিবের উপস্থাপনা মূলত সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল নিয়ে গঠিত, যেখানে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের লাভজনকতা, কর্পোরেট শাসনব্যবস্থার ভূমিকা এবং বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংস্কৃতির গুরুত্ব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে শাসনব্যবস্থা একা যথেষ্ট নয়; সংস্কৃতির গুণগত মানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে যে যখন কোম্পানির অভ্যন্তরে নৈতিক মানদণ্ড ও স্বচ্ছতা বাড়ে, তখন গোপন তথ্যের ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয় এবং ইনসাইডারদের লাভের মার্জিন কমে যায়। ফলে তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন থেকে দূরে সরে যায়।
কর্পোরেট শাসনব্যবস্থার মধ্যে বোর্ডের স্বাধীনতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দৃঢ়তা এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। হাবিবের মতে, এই কাঠামোগত উপাদানগুলো সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয় করলে বাজারের ন্যায়বিচার আরও শক্তিশালী হয়।
সংস্কৃতির উন্নয়ন বলতে কর্মচারীদের নৈতিক দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী মূল্য সৃষ্টির প্রতি অঙ্গীকারকে বোঝায়। এমন পরিবেশে গোপন তথ্যের লিকেজ কমে এবং বাজারের অংশগ্রহণকারীরা সমান সুযোগ পায়।
হাবিব জোর দিয়ে বলেন যে সংস্কৃতির উন্নতি সরাসরি ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের লাভ কমায়, ফলে এই অনৈতিক কার্যকলাপের আকর্ষণ হ্রাস পায়। তিনি উল্লেখ করেন যে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের পাশাপাশি সংস্থার অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করে সংস্কৃতিগত পরিবর্তনকে নীতি স্তরে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। তিনি ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারকদেরকে সংস্কৃতি-ভিত্তিক মূল্যায়ন মডেল গ্রহণের পরামর্শ দেন।
সেমিনারটি হিসাব গবেষণা উদ্যোগ (ARI) দ্বারা আয়োজিত হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিভাগের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান সরকার উন্মুক্তিকরণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এই উদ্যোগটি কর্পোরেট শাসন ও নৈতিকতা নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত।
অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ARI-র পরিচালক মোঃ সাইফুল আলম, হিসাব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আল-আমিন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ রকিবুর রহমান এবং দুর্নীতি বিরোধী কমিশনের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মোরশেদ আলম উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, যদি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো সংস্কৃতিগত রূপান্তরে অগ্রাধিকার দেয়, তবে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারের তরলতা, মূলধন সংগ্রহের খরচ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও সংস্থার সংস্কৃতি সমন্বিত নীতি গঠনই মূল চাবিকাঠি হবে।



