যুক্তরাষ্ট্র বুধবার এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সোলার অ্যালায়েন্স (আইএসএ) থেকে বেরিয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে জাতিসংঘের ৩১টি সংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ ত্যাগ করা হয়েছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বিরোধী হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।
আইএসএ-এর সদর দফতর ভারতের হরিয়ানার গুরুগ্রামে অবস্থিত। এই জোটটি ২০১৫ সালে প্যারিসের কপ২১ সম্মেলনে ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়। মূল লক্ষ্য ছিল কর্কট ও মকর রেখার মধ্যে ১২০টির বেশি দেশে সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে জোটটি ২০৩০ সালের মধ্যে এক লাখ কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে এক হাজার গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা করেছে। বর্তমানে ১০০টির বেশি দেশ এই জোটের সদস্য, যার মধ্যে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। তবে কয়েক বছর ধরে প্রকল্পের অগ্রগতিতে ধীরগতি নিয়ে সমালোচনা তীব্র হয়েছে।
বিশেষ করে আফ্রিকায় বেশ কয়েকটি সৌর প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হলেও তা এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি। লাতিন আমেরিকায়ও একই রকম বাধা দেখা দিয়েছে, যা জোটের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই ধীরগতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘ধোঁকাবাজি’ বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির চেয়ে কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানকে বেশি সমর্থন করে। ২০২৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তিনি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলোর তহবিল সীমিত করে চলেছেন।
এই নীতি পরিবর্তনের সরাসরি ফলস্বরূপ আইএসএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার ঘটেছে। ট্রাম্পের প্রশাসন জোটের কার্যক্রমকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না বলে বিবেচনা করেছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এখন জোটের সদস্য দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই পদক্ষেপটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও দুই দেশ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ, তবে জ্বালানি নীতিতে পার্থক্য বাড়তে পারে। বিশেষত, ভারতীয় সরকার আইএসএ-কে তার নবায়নযোগ্য শক্তি লক্ষ্যের মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, জোটের অন্যান্য সদস্য দেশগুলো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করে এবং আইএসএ-র কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অবদান ছাড়া প্রকল্পগুলোকে কীভাবে চালু রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সহায়তা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
আইএসএ-র পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন ২০২৬ সালে নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে সদস্য দেশগুলো নতুন তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার কৌশল নির্ধারণ করবে। জোটের নেতৃত্বাধীন দল এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি কীভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবে।
দূরদর্শী কূটনীতিকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার জোটের কাঠামোকে পুনর্গঠন করার সুযোগ দিতে পারে। নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে জোটের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন বাড়তে পারে এবং প্রকল্পের গতি ত্বরান্বিত হতে পারে। তবে, তহবিলের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে।
ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের সূত্র অনুযায়ী, ভারত সরকার আইএসএ-র কার্যক্রমে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে চলেছে এবং জোটের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সরকার ইতিমধ্যে কয়েকটি বড় স্কেল সৌর প্রকল্পের জন্য নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা জোটের সামগ্রিক উৎপাদন লক্ষ্যে অবদান রাখবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের আইএসএ থেকে প্রস্থান আন্তর্জাতিক সৌর জোটের কৌশলগত দিকনির্দেশে পরিবর্তন আনবে। ভারত-নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নতুন তহবিলের উৎস, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং সদস্য দেশগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার উপর। পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন এই পরিবর্তনের মূল মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হবে।



