লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ট্রেডার সমবায় সংস্থা আজ দেশের সব অঞ্চলে গ্যাসের বিপণন ও সরবরাহে চলমান অনির্দিষ্টকালীন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে। সমবায়ের সভাপতি মো. সেলিম খান এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন, যা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বি.ই.আর.সি.) এর অফিসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর নেওয়া হয়।
বৈঠকে ট্রেডাররা তিনটি মূল দাবি উপস্থাপন করে: প্রথমত, দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ করা; দ্বিতীয়ত, বিতরণ ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধি করা; তৃতীয়ত, গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এই দাবিগুলি গ্যাসের বাজারে স্থিতিশীলতা ও ব্যবসায়িক লাভজনকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে তোলা হয়।
বি.ই.আর.সি.ের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ট্রেডারদের আশ্বাস দেন যে, প্রশাসনিক অভিযান সংক্রান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে এবং চার্জ সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গ্যাসের সরবরাহ সংকটের অবসান আগামী সপ্তাহের মধ্যে ঘটতে পারে।
এই আশ্বাসের পেছনে রয়েছে এলপিজি অপারেটরস্ অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিবেদন, যেখানে বলা হয়েছে যে, জাহাজের ঘাটতি সত্ত্বেও তারা বিকল্প আমদানি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে গ্যাসের অভাব কমে আসবে এবং বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মো. সেলিম খান উল্লেখ করেন, বর্তমান বাজারে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রির ন্যূনতম মূল্য টাকার ১,৫০০ টাকার নিচে নামানো সম্ভব নয়, কারণ অপারেটরদের কাছ থেকে ক্রয়মূল্য ইতিমধ্যে টাকার ১,৩০০ টাকার উপরে। এই মূল্য পার্থক্য ট্রেডারদের মার্জিন সংকুচিত করে এবং বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দেয়।
চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এই বিষয়টি নিয়ে বলেন, সরকার কর্তৃক জানুয়ারি মাসে নির্ধারিত টাকার ১,৩০৬ সিলিন্ডার মূল্যের উপরে বিক্রি করা যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাসের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং ভোক্তাদের অতিরিক্ত বোঝা কমানো প্রয়োজন।
এই সমঝোতার ফলে গ্যাসের দাম সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে যাবে বলে বাজার বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তবে, জাহাজের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক গ্যাস মূল্যের ওঠানামা এখনও মূল ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে দাম পুনরায় বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বাজারে ইতিমধ্যে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, বিশেষত শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে গৃহস্থালী ও বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ছে। ধর্মঘটের প্রত্যাহার এই চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
অন্যদিকে, গ্যাসের বিতরণ ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বৃদ্ধির দাবি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বি.ই.আর.সি. এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নীতি নির্ধারণের পরিকল্পনা করেছে, যাতে ব্যবসায়িক খরচ ও ভোক্তা মূল্য উভয়ই সুষম থাকে।
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহে সম্ভাব্য ঘাটতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা গৃহস্থালী গ্যাস ব্যবহারকারী ও রেস্টুরেন্ট, হোটেল ইত্যাদি বাণিজ্যিক সেক্টরের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সামগ্রিকভাবে, ধর্মঘট প্রত্যাহার এবং বি.ই.আর.সি.র সঙ্গে সমঝোতা গ্যাস বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা যায়। তবে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং জাহাজের ঘাটতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন, যাতে কোনো অপ্রত্যাশিত সংকটের পূর্বে পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও সরবরাহের দিক থেকে মূল ঝুঁকি হিসেবে আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ, জ্বালানি রপ্তানি নীতি এবং মৌসুমী চাহিদা উল্লেখযোগ্য। এসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিল্পের মধ্যে চলমান সংলাপ গ্যাস বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



