ইরানে দামের তীব্র বৃদ্ধি ও রিয়েলের মান হ্রাসের প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভের দ্বাদশ দিনে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রতিবাদকারীদের সমর্থন জানিয়ে ইরান সরকারের নিন্দা করেছেন; একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে হস্তক্ষেপবাদী ও প্রতারণামূলক বলে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে।
দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক উর্ধ্বগতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে দেশের ছোট শহরগুলোতেও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। এই দিনগুলোতে বিভিন্ন শহরের বিক্রেতারা তাদের দোকান বন্ধ করে বিক্ষোভে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা পূর্বে নগর কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল এমন আন্দোলনের বিস্তারকে স্পষ্ট করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ‘হত্যা’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে ‘হস্তক্ষেপবাদী এবং প্রতারণামূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, এই অবস্থান কোনো মানবিক সহানুভূতি থেকে উদ্ভূত নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ চাপ, হুমকি এবং হস্তক্ষেপের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি কেবল অর্থনৈতিক যুদ্ধ নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের রূপ নেয়। মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া প্রচারণা, মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি এবং সহিংসতার প্ররোচনাকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছে।
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে কমপক্ষে ৩৯ জন নিহত হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি পারসিয়ান স্বাধীনভাবে ২১ জনের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে, যা ঘটনার তীব্রতা ও মানবিক ক্ষতির মাত্রা তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসি পারসিয়ানকে জানিয়েছে, ইরানের বর্তমান বিক্ষোভগুলো ইরানি জনগণের ক্ষোভের সরাসরি প্রতিফলন। মন্ত্রণালয় যুক্তি দিয়েছে, সরকার জনগণকে উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়াই এই বিশাল প্রতিবাদের মূল কারণ।
ইরানের সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই তীব্র বিরোধ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার ফলে দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপ কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং বিদ্যমান পারস্পরিক বিশ্বাসের ফাটল আরও গভীর হতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধিকে তীব্র করে তুলবে। বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের পার্থক্য সরকারকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করতে পারে, যা আবার মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ বাড়াবে।
পরবর্তী সময়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্ভবত আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানাবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আরও নীতি সমন্বয় বা কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হতে পারে।
বিক্ষোভের তীব্রতা, মৃত্যুর সংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বন্দ্বের মিশ্রণ ইরানের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন মোড় আনতে পারে। দেশীয় ও বৈদেশিক পর্যায়ে উভয় পক্ষের পদক্ষেপের ফলাফলই ভবিষ্যতে ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে।



