জাপানে গত বছরে ৫২৭ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট তীব্রতর হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের প্রেক্ষিতে সরকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় একটি জাতীয় সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করেছে। মূল লক্ষ্য হল বুলিং, উদ্বেগ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি কমাতে শিশুদের বড়দের সঙ্গে তাদের সমস্যাগুলো শেয়ার করতে উৎসাহিত করা।
শিশু ও পরিবার বিষয়ক সংস্থা, চিলড্রেন অ্যান্ড ফ্যামিলিজ এজেন্সি, ২০২৪ সালের শরতে ৩০ জন কর্মকর্তার নিয়ে একটি বিশেষ প্রকল্প দল গঠন করে। দলটির প্রধান কাজ হল শিশুদের মানসিক পরামর্শ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা ভ্রান্ত ধারণা দূর করা। কর্মকর্তারা জানান, অনেক শিশু সাহায্য চাওয়াকে লজ্জা বা দুর্বলতার চিহ্ন হিসেবে দেখে, যা তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বিরত রাখে।
এই বাধা ভাঙতে উদ্যোগের সূচনা করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে টোকিওর চোফুতে অনুষ্ঠিত জে-লিগের একটি ম্যাচের সময় এফসি টোকিওর সহযোগিতায় একটি আউটরিচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ম্যাচের ভিড়ের মাঝখানে একটি বুথ স্থাপন করা হয়, যেখানে শিশুদেরকে তাদের সমস্যার কথা কার সঙ্গে ভাগ করতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়। অংশগ্রহণকারীরা পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু ইত্যাদি বিভিন্ন বিকল্পের নাম লিখে একটি বাক্সে ফেলে দেয়।
বুথে উপস্থিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। প্রথম শ্রেণির একটি শিশুরা জানান, বন্ধু সঙ্গে ঝগড়ার পর তারা পরিবার ও শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করেছে। অন্যদিকে, একজন মা উল্লেখ করেন, তার সন্তান সবসময় তার সঙ্গে খোলামেলা ভাবে কথা বলে, যা তার জন্য মানসিক সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
প্রকল্প দল এই ধরনের কার্যক্রমকে ধারাবাহিক করার পরিকল্পনা করেছে। চলতি মাসের শেষ দিকে জুনিয়র হাই এবং হাই স্কুলে বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের কথা শোনার ওপর জোর দেওয়া হবে। এই ক্লাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ, স্ট্রেস ও সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে স্বাভাবিকভাবে আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া হবে। দলটির একজন তরুণ কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, তারা শিক্ষার্থীদের বোঝাতে চান যে দুশ্চিন্তা নিয়ে কথা বলা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
এই উদ্যোগের পেছনে থাকা নীতি হল মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা। শিশুদেরকে সাহায্য চাওয়া লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি তাদের সুস্থতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গৃহীত হওয়া দরকার। সরকার এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার জন্য স্কুল, পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক উপকরণ বিতরণ করবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রাথমিক হস্তক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বুলিং প্রতিরোধে কঠোর নীতি এবং দ্রুত পরামর্শ সেবা প্রদান এই সমস্যার সমাধানে মূল চাবিকাঠি। সরকার এই দিকগুলোকে শক্তিশালী করতে আইনগত কাঠামো ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
সামগ্রিকভাবে, জাপানের এই নতুন উদ্যোগটি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়াতে এবং আত্মহত্যা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তবায়নের সময় যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন, যাতে প্রোগ্রামের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও নীতি নির্ধারকদের জন্য প্রশ্ন রয়ে যায়: কীভাবে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রমকে দৈনন্দিন শিক্ষার অংশে সংহত করা যায়, যাতে শিশুরা স্বাভাবিকভাবে তাদের মানসিক চাহিদা প্রকাশ করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতে আত্মহত্যা হ্রাসের মূল চাবিকাঠি হতে পারে।



