চট্টগ্রাম নগরের আতুরা ডিপো এলাকায় বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের গৃহস্থালির চুলা তিন দিন ধরে জ্বালানো যাচ্ছে না। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার শেষ হওয়ার পর থেকে তিনি আশপাশের সব দোকান ঘুরে দেখেছেন, তবে কোনো বিক্রয়যোগ্য সিলিন্ডার পাননি। শেষ পর্যন্ত তিনি শহরের ষোলশহর এলাকায় একটি এলপিজি বিক্রির দোকানে গিয়ে জানেন, বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ।
সাইদুল ইসলাম জানান, তিন কিলোমিটার দূরে গিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যায়নি এবং দাম বাড়িয়ে দিলেও বিক্রি হচ্ছে না। তার পরিবারের মধ্যে অসুস্থ সন্তান রয়েছে, গরম পানির প্রয়োজন নিয়মিত, ফলে খাবার প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আগে থেকে সিলিন্ডার মজুদ রাখলে এই সমস্যার মুখোমুখি হতেন না।
ষোলশহর এলাকার এলপিজি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান সোহেল এন্টারপ্রাইজের প্রধান মোহাম্মদ সোহেল জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে সরবরাহকারীরা সিলিন্ডার পৌঁছে দিতে পারছেন না। ক্রেতারা খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে ভিড় করছেন, তবে বিক্রয়ের জন্য কোনো স্টক নেই। তিনি উল্লেখ করেন, সাইদুলের মতোই শহরের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, ফলে খাবার দোকানগুলোও রান্না করতে পারছে না।
এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড আজ সকাল থেকে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। সমিতি জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন মূল্য সমন্বয়, সরবরাহকারীদের ওপর হয়রানি ও জরিমানা বন্ধের দাবি পূরণ না হলে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মানা না হলে, অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ থাকবে।
হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ তামিমের বাড়িতে গতকাল হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যায়। তার পরিবার হোটেল খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তামিম দুই নম্বর গেট এলাকায় সিলিন্ডার খুঁজতে গিয়ে গ্যাসের সন্ধানে ৫০০ টাকা গাড়িভাড়া খরচ করেন, তবু কোনো সিলিন্ডার পাননি। তিনি জানান, কখন সিলিন্ডার পাওয়া যাবে কেউ জানে না।
আগ্রাবাদ এলাকার মোহাম্মদ আইয়ুবের অভিযোগে দেখা যায়, বড় কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবরাহে দেরি করছে এবং বাজারে সিলিন্ডার ঘাটতি বাড়িয়ে তুলছে। এই ধরনের ঘাটতি শুধু গৃহস্থালী নয়, রেস্টুরেন্ট ও খাবার দোকানগুলোর কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহের এই বাধা গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছে। বিইআরসির মূল্য সমন্বয় ও সরবরাহকারীদের ওপর আর্থিক চাপের ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটেছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত খরচ আর অপ্রতুল সেবা চাপিয়ে দিচ্ছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায়ের কঠোর পদক্ষেপের ফলে স্বল্পমেয়াদে বিক্রয় বন্ধের ঝুঁকি বাড়বে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহকারীদের সঙ্গে সমন্বয় না হলে বাজারে কালো বাজারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বায়ো গ্যাস বা ইলেকট্রিক হিটার ব্যবহার বাড়তে পারে, তবে তা তৎক্ষণাৎ সব গৃহস্থালিতে সম্ভব নয়।
সরবরাহ সমস্যার ফলে গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়ছে। গ্যাসের বিকল্প না থাকলে রেস্তোরাঁ ও খাবার দোকানগুলো বিক্রয় হ্রাসের ঝুঁকিতে, ফলে কর্মসংস্থান ও আয়েও প্রভাব পড়তে পারে।
বিইআরসির নতুন মূল্য নীতি ও সরবরাহকারীদের ওপর আরোপিত শর্তগুলো যদি সমাধান না হয়, তবে গ্যাস বাজারে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত হস্তক্ষেপ, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা ও মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক সেক্টরে অপ্রয়োজনীয় ব্যাঘাত না ঘটে।
এই সংকটের সমাধানে স্বল্পমেয়াদে বিকল্প গ্যাস সিলিন্ডার আমদানি, স্থানীয় গ্যাস ট্যাঙ্কারির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সমন্বয়ের ধাপগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি উৎসের বিকাশ ও অবকাঠামো শক্তিশালী করা বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।



