সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলায় ২১ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে ইলেকট্রিক সাইকেল চালিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া মানিক হোসেনের গলাকাটা হিংসা ঘটার পর, স্থানীয় জজ আদালত তিনজন সন্দেহভাজনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। মামলাটি সিরাজগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন ছিল এবং বিচারক মো. ইকবাল হোসেন রায় প্রদান করেন।
আদালতের রায়ে খোকন শেখ, সাদ্দাম শেখ এবং রাব্বি ওরফে হাবিব শেখকে প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডে শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্তভাবে প্রত্যেককে বিশ হাজার টাকার জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। রায়ের ভিত্তি ছিল গলাকাটা হত্যার প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং অপরাধের গুরত্বপূর্ণ প্রমাণাদি।
খোকন শেখ হলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের বাবু শেখের পুত্র; সাদ্দাম শেখ হলেন ছামাদ শেখের পুত্র; আর রাব্বি ওরফে হাবিব শেখ হলেন আব্দুল আলী আরিফের পুত্র। তিনজনই একই গ্রামেই বসবাস করতেন এবং মামলায় তাদের নাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মানিক হোসেন ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর বিকালে তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইলিশের মতো সবুজ রঙের ইলেকট্রিক সাইকেল নিয়ে গিয়ে যান। তবে তিনি আর কখনো বাড়ি ফিরে আসেননি। সন্ধ্যাবেলা পরিবার তার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করে তৎক্ষণাৎ অনুসন্ধান শুরু করে।
রাত দশটার দিকে মানিকের মোবাইল ফোন বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়, যা পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত পরিবার এবং প্রতিবেশীরা তাকে খুঁজতে ঘুরে বেড়ায়, তবে কোনো ফলাফল না পেয়ে হতাশ হয়।
পরের দিন সকালে পরিবার লোকমুখে শুনে যে কামারখন্দ থানার ঝাঐল উত্তরপাড়া গ্রামের বেতের বাগানের মধ্যে একটি গলাকাটা দেহ পাওয়া গেছে। স্থানীয় পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে এবং পরিবারকে দেখিয়ে নিশ্চিত করে যে তা মানিক হোসেনের। দেহের অবস্থান এবং গলাকাটার ধরন থেকে স্পষ্ট হয় যে এটি হিংসাত্মক হত্যাকাণ্ডের ফল।
মানিকের মা, হাফিজা খাতুন, দেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই কামারখন্দ থানায় হত্যার মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তকারী পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সন্দেহভাজনদের সনাক্ত করে এবং খোকন শেখ, সাদ্দাম শেখ ও রাব্বি ওরফে হাবিব শেখকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময়ই খোকন শেখের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চুরি হওয়া ইলেকট্রিক সাইকেলটি পুনরুদ্ধার করা যায়।
সন্দেহভাজন খোকন শেখ আদালতে ১৬৪ ধারার অধীনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন, যেখানে তিনি গলাকাটা হত্যার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার স্বীকারোক্তি করেন। তার স্বীকারোক্তি এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দায়ের করে।
মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং পুনরুদ্ধারকৃত সাইকেলকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আদালত সব প্রমাণ পর্যালোচনা করে এবং শাস্তি নির্ধারণের সময় অপরাধের গুরত্ব, শিকারীর পরিবারে সৃষ্ট কষ্ট এবং সমাজের নিরাপত্তা রক্ষার দিকগুলোকে বিবেচনা করে।
বিচারকের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে বিশ হাজার টাকার জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, যা শাস্তির আরেকটি দিক হিসেবে গণ্য হবে। রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী রফিক সরকার জানান যে, দোষী সাব্যস্তদের আপিলের অধিকার থাকবে এবং উচ্চতর আদালতে মামলাটি চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।
বর্তমানে, অভিযুক্তদের আপিলের জন্য সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে এবং আপিল দাখিল হলে মামলাটি আপিল আদালতে পর্যালোচনা হবে। আপিল প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত প্রমাণ বা আইনি যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে, তবে বর্তমান রায়ের ভিত্তি অপরিবর্তিত থাকবে যতক্ষণ না উচ্চতর আদালতে নতুন রায় দেওয়া হয়।
এই মামলাটি সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ এলাকায় ইলেকট্রিক সাইকেল ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে আবারো তীব্র করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ এখন থেকে ইলেকট্রিক যানবাহনের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত নজরদারি এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করার পরিকল্পনা করেছে।
শিকারের পরিবার এখনো শোকাহত, তবে তারা আদালতের রায়কে ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ভবিষ্যতে একই রকম ঘটনা রোধে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহযোগিতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন।
এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার সকল ধাপ মেনে চলতে হবে এবং আপিলের মাধ্যমে যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই ধরনের কঠোর শাস্তি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।



