বাংলাদেশের রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাবারগুলো কেবল পেট ভরাই না, বরং মানুষের হৃদয়ে এক ধরনের সংযোগ গড়ে তোলে। ছোটবেলায় ফুচকার তীব্র মশলার স্বাদ, রোদে গরম কাগজের থালায় পরিবেশিত খাবার এবং স্কুলের সামনে থাকা স্টলগুলো বহু মানুষের যৌথ স্মৃতিতে রূপ নেয়। আজও এই খাবারগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনুভূতি, শহর থেকে গ্রাম, ধনী থেকে গরিব সব স্তরে একসাথে ভাগ করা হয়।
লেখকের শৈশবের স্মৃতিতে, দ্বিতীয় শ্রেণির পর থেকে গ্রীষ্মের বিকেলে অচেনা উত্তেজনা ভরিয়ে দিতো গরম রোদের নিচে ফুচকা খাওয়ার আনন্দ। একদিন, লেখকের চাচি সঙ্গে গোপনে স্কুলের সামনে থাকা স্টলে গিয়ে অতিরিক্ত মশলা চেয়ে নেওয়া হতো, যদিও জানত যে বাড়ি ফিরে নাক থেকে জল ঝরবে। প্রতিটি কামড়ে তেঁতুলের টক স্বাদ ও মশলার তীব্রতা এক ধরনের গোপনীয়তা তৈরি করত, যা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হতো এবং অপরিচিত পথচারীর হাসি-হাস্যেও মিশে যেত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাচি অন্য জায়গায় চলে গেলেন, ফলে ঐ স্টলটি আর দেখা যায় না। তবু ফুচকার স্বাদ ও গন্ধ লেখকের মনের গভীরে রয়ে গিয়েছে, যেন কোনো পুরনো ছবি যেন স্মৃতির অ্যালবামে লুকিয়ে আছে। এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাবারগুলো কেবল ক্ষণস্থায়ী স্বাদ নয়, বরং অতীতের সঙ্গে সংযোগের সেতু।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ একই রকম অনুভূতি ভাগ করে। কেউ পান্তা ভাতের সঙ্গে লবণাক্ত চাটনি, কেউ চাটনি দিয়ে ভর্তা, আবার কেউ জিলাপি বা মিষ্টি দইয়ের স্বাদকে স্মৃতির পাতা হিসেবে ধরে রাখে। প্রত্যেকের নিজস্ব গল্প থাকলেও, খাবারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সমবায়িক অনুভূতি একটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে স্ট্রিট ফুডের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসা, দেশের সাংস্কৃতিক বুননে একসাথে বোনা হয়।
সাহরিশ নাজমুল, ও-লেভেল শিক্ষার্থী, যিনি দূরবর্তী গ্রামীণ এলাকায় বড় হয়েছেন, তার কথায় স্পষ্ট হয় যে তিনি শৈশবেই নিজের সংস্কৃতি সরাসরি উপভোগ করার সুযোগ পাননি। তবু তিনি জানান যে রাস্তায় পাওয়া গরম, স্যাপি জিলাপি তার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী সংযোগের সেতু হয়ে উঠেছে। “আমি সরাসরি আমার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারিনি,” তিনি বলেন, “কিন্তু গরম জিলাপির মিষ্টি স্বাদ আমাকে আমার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে।” তার এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাবারগুলো কেবল পেটের তৃপ্তি নয়, বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
স্ট্রিট ফুডের এই বহুমুখী ভূমিকা, যা শৈশবের আনন্দ, সামাজিক মেলামেশা এবং সাংস্কৃতিক সংযোগের সেতু হিসেবে কাজ করে, তা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যখন শহরের কোলাহল ও গ্রাম্য শান্তি একত্রে মিশে যায়, তখনই খাবারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই ঐক্য আরও দৃঢ় হয়। তাই, রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাবারগুলোকে শুধু সস্তা স্ন্যাক হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।
পাঠকরা যদি এই স্মৃতিগুলোকে পুনরায় জীবন্ত করতে চান, তবে তাদের নিকটস্থ রাস্তায় গিয়ে ঐতিহ্যবাহী খাবার চেখে দেখা উচিত। এক গরম থালায় ভরা ফুচকা, মশলাদার চাটনি, অথবা স্যাপি জিলাপি কেবল স্বাদই নয়, অতীতের সঙ্গে সংযোগের সেতু। এভাবে রাস্তায় খাবার খাওয়া, আমাদেরকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং দেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণে সহায়তা করে।



