জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রবিবার জামাত-ইসলামি ও তার মিত্রদের সঙ্গে সিট‑শেয়ারিং চুক্তি স্বাক্ষর করে নির্বাচনী জোটে প্রবেশ করেছে। ২০২৪ সালের ব্যাপক প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ শাসনভঙ্গের পর ছাত্র নেতাদের দ্বারা গঠিত এনসিপি, পূর্বে সব ৩০০টি আসন জয় করার লক্ষ্য ঘোষণা করলেও এখন ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র বিতর্ক উন্মোচিত হয়েছে।
বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, জামাত‑ইসলামির জন্য এনসিপি জোটে আনা একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সাফল্য, যা তার ঐতিহাসিক প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক লেখক মোহিউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন যে এনসিপি “রাষ্ট্র‑কেন্দ্রিক রাজনীতি” অনুসরণ করে এবং স্বার্থসাপেক্ষে যে কোনো জোটে যুক্ত হতে পারে, তবে এই ধরনের সমঝোতা নির্বাচন শেষে টিকে না থাকতে পারে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক ও বিশ্লেষক সালাহুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর জোটকে “বুঝাপড়ার রাজনীতি” হিসেবে বর্ণনা করে, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত জোট‑রাজনীতির বাইরে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তবে এনসিপির প্রতিষ্ঠাতারা এবং কিছু কেন্দ্রীয় নেতা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, এবং দলীয় অভ্যন্তরে বহু নেতা ও কর্মী পদত্যাগ বা নির্বাচনী প্রার্থী থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এনসিপি ২০২৪ সালের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ শাসনভঙ্গের পর নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দলটি সব ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকার গঠনের লক্ষ্য রাখে বলে বারবার প্রকাশ করেছিল। তবে জামাত‑ইসলামি ও অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সিট‑শেয়ারিং চুক্তি স্বাক্ষর করার পর বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই জোট এনসিপির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা কীভাবে প্রভাবিত করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর এনসিপির ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, এবং কিছু নেতা দল ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তদুপরি, কিছু কর্মী নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে গিয়ে দলকে “অপ্রাসঙ্গিক” বলে সমালোচনা করেন। এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ এনসিপির রাজনৈতিক প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি, যা ২০২৪ সালের প্রতিবাদে ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে, তার মূল লক্ষ্য ছিল নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠন এবং তরুণ প্রজন্মের স্বরকে সংসদে পৌঁছে দেওয়া। তবে জামাত‑ইসলামি ও অন্যান্য ধর্মীয় পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করার ফলে তার মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন উঠেছে।
বৈধতা ও স্বচ্ছতার দিক থেকে এনসিপি এখনো স্পষ্টতা প্রদান করেনি যে, জোটের মধ্যে তার নীতি ও প্রোগ্রাম কীভাবে সংযুক্ত হবে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি এনসিপি তার স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে না পারে, তবে তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা সংকুচিত হতে পারে।
এই জোটের সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে ভোটারদের বিভাজন, বিশেষত তরুণ ভোটারদের মধ্যে এনসিপির প্রতি আস্থা হ্রাস। একই সঙ্গে, জামাত‑ইসলামি এই জোটের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে, যা দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি করতে পারে।
অবশেষে, নির্বাচনের আগে এনসিপি ও জামাত‑ইসলামির জোটের কার্যকারিতা এবং স্থায়িত্বের উপর নজর থাকবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সমঝোতা নির্বাচনী ফলাফলে কীভাবে প্রভাব ফেলবে এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কী পরিবর্তন আনবে তা সময়ই প্রকাশ করবে।
এনসিপি ও জামাত‑ইসলামির জোটের পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারণের জন্য পার্টিগুলোকে স্পষ্ট নীতি ও প্রোগ্রাম উপস্থাপন করতে হবে, যাতে ভোটারদের কাছে তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ বিরোধ সমাধান করে দলীয় ঐক্য বজায় রাখা তাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
সামগ্রিকভাবে, জাতীয় নাগরিক পার্টির জামাত‑ইসলামি জোটে প্রবেশ দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন গতিবিধি সৃষ্টি করেছে, তবে এই পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, জোটের স্থায়িত্ব এবং এনসিপির স্বতন্ত্রতা বজায় রাখা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



