২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রাশিয়া একটি গোপন প্রস্তাব উপস্থাপন করে, যেখানে ইউক্রেনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বদলে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সমর্থন প্রত্যাহার করার শর্ত রাখা হয়। এই প্রস্তাবের বিশদ তথ্য সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হয়, যা রাশিয়ার কূটনৈতিক কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভেনেজুয়েলা নীতির মধ্যে সরাসরি সংযোগ নির্দেশ করে।
রাশিয়ার প্রস্তাবের মূল বিষয় ছিল, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ বা ইউক্রেনে রাশিয়ার ইচ্ছামতো কাজের স্বাধীনতা দেয়, তবে রাশিয়া পশ্চিম গোলার্ধে, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায়, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পদক্ষেপ স্বীকার করবে। এই ধারণা তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ফিওনা হিলের সাক্ষাৎকারে প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি রুশ কর্মকর্তাদের বারবার ইঙ্গিতের কথা উল্লেখ করেন।
হিলের মতে, রাশিয়ার এই প্রস্তাবের পটভূমি ১৯শ শতকের মনরো নীতির অনুকরণে গড়ে উঠেছিল। ঐ নীতি অনুযায়ী, পশ্চিমা দেশগুলো ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের পরিবর্তে আমেরিকাকে ইউরোপীয় বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিত। রাশিয়া এই ঐতিহাসিক কাঠামোকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউক্রেনের বিষয় থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করতে চেয়েছিল।
সেই সময়ে রাশিয়ার কূটনীতিক অ্যানাটলি আন্তোনভ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে রুশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, হিলকে বহুবার একই ধরনের ইশারা ও গোপন প্রস্তাব দেন। তবে হোয়াইট হাউস সেই প্রস্তাবের প্রতি কোনো সাড়া দেয়নি এবং ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলাকে দুটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে এগিয়ে যায়। ফলে রাশিয়ার প্রস্তাবটি বাস্তবে কোনো চূড়ান্ত ফলাফল পায়নি।
বছর পর, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের ন্যায্যতা দিতে একই মনরো নীতির রেফারেন্স ব্যবহার করে। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভেনেজুয়েলার শাসনভূমি ও তেল সম্পদ পরিচালনার ঘোষণা দেয়, যা পূর্বে রাশিয়া যে শর্ত প্রস্তাব করেছিল তার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বর্তমান ট্রাম্পের পদক্ষেপগুলো রাশিয়ার পুরনো “প্রভাব বলয়” তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা যায়। রাশিয়া যখন ২০১৯ সালে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণের বদলে ভেনেজুয়েলায় সমর্থন প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়, তখনই যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের কৌশল আজ ভেনেজুয়েলা বিষয়ক নীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই সমান্তরালতা আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তি ভারসাম্যের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন করে।
অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের ফলে পশ্চিমা মিত্রদের জন্য রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণকে “অবৈধ” বলে নিন্দা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একই ধরনের অজুহাতে একটি স্বাধীন দেশের সরকারকে হটিয়ে দিয়েছে, যা রাশিয়ার “জোর যার মুলুক তার” নীতিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা প্রদান করে। ফলে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আগ্রাসনকে নিন্দা করা এখন দ্বিমুখী রাজনৈতিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলা অভিযানে এটিকে “আইন প্রয়োগকারী অভিযান” হিসেবে উপস্থাপন করলেও, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন যে এই রূপকল্প রাশিয়ার কূটনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য অঞ্চলে অনুরূপ বিনিময়মূলক প্রস্তাবের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ২০১৯ সালের রাশিয়ার গোপন বিনিময় প্রস্তাব এবং আজকের যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পুরনো তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি নির্দেশ করে। বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন ধরনের কূটনৈতিক বিনিময় বাড়তে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করছেন, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও শক্তি কাঠামোর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।



