যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ৭ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা তেল সম্পদের ওপর অনির্দিষ্টকালীন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়। নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করার পর, ট্রাম্প সরকার তেলের বিক্রয় ও অর্জিত অর্থের ব্যবহার একতরফা নির্ধারণ করবে বলে ঘোষণা করেছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানায়, ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলা তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে এবং বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত সব অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় তিন থেকে পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই তেল বিক্রয়ের আয় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী শুধুমাত্র আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে।
ট্রাম্পের সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ এ প্রকাশিত এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলা তেল চুক্তি থেকে প্রাপ্ত তহবিল দিয়ে দেশটি কেবলমাত্র আমেরিকান উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করতে পারবে। এতে কৃষি পণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জ্বালানি শিল্পের যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত। এই শর্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও সেবা খাতের রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘ভয়াবহ’ বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই নীতি তেলের সম্পদকে শোষণ করার গোপন পরিকল্পনা এবং এর পিছনে বড় তেল কোম্পানিগুলোর প্রভাব বেশি। ওয়ারেনের মতে, আমেরিকান জনগণকে এই ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষকরা এই ব্যবস্থা ১৯৭০-এর দশকের পূর্বের ‘ইজারা প্রথা’র সঙ্গে তুলনা করেন। সেই সময়ে তেলের মালিক দেশগুলো থাকলেও বিক্রয় ও মুনাফার অধিকাংশ অংশ পশ্চিমা কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেন, বর্তমান নীতি তেলের সম্পদকে পুনরায় বহিরাগত শোষণের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলা সম্পর্কিত দুইটি জাহাজ জব্দ করেছে, যার মধ্যে একটি রুশ পতাকাবাহী জাহাজও রয়েছে, যা উত্তর আটলান্টিকের নিকটে ধরা পড়ে। জাহাজ জব্দের কারণ হিসেবে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচারের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এই নৌ-অবরোধের ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।
ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই তেল সংক্রান্ত বিরোধ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন সংকটের সূচনা করতে পারে। তেলের বিক্রয় ও তহবিলের ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধ উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে এই পরিস্থিতি তেল বাজারের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল বিক্রয় নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা ভেনেজুয়েলার সরকার এবং আন্তর্জাতিক তেল সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। তেল বিক্রয়ের আয় কীভাবে পুনর্বণ্টন হবে এবং তাতে ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থ কতটা রক্ষা পাবে, তা পরবর্তী আলোচনার মূল বিষয় হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের আইনি ও নৈতিক দিকও আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল নীতি এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা উভয়ই বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তেল বাজারের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তদুপরি, ভেনেজুয়েলার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে তেল বিক্রয়ের আয় কতটা ব্যবহার হবে, তা ভবিষ্যৎ নীতির সাফল্য নির্ধারণ করবে।



