ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে শাসন গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে; আন্তর্জাতিক আইন ও শিষ্টাচারের বদলে সামরিক শক্তি ও বলপ্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গোপনীয় সামরিক অভিযান মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া এই নতুন নীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, বাস্তব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শিষ্টাচার নয়, ক্ষমতা ও শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
মিলার যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যকে অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং মাদুরোর গ্রেপ্তারকে “আইনশৃঙ্খলা রক্ষা অভিযান” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে এক সার্বভৌম দেশের ওপর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করছেন। মাদুরোকে অপসারণের পর ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় দেশটিতে গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর গ্রেপ্তারকে সম্পন্ন করতে কংগ্রেসের পূর্ব অনুমোদন চায়নি, যা অভ্যন্তরীণভাবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিছু আইনগত বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানিক প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন হিসেবে এই পদক্ষেপকে দেখছেন, অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন যে ট্রাম্পের দল এই ধরনের সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে চায়, যাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার শক্তি প্রদর্শন করা যায়।
মিলার মাদুরো-অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির তালিকায় নতুন করে কলম্বিয়া, মেক্সিকো এবং ইরানের নাম যুক্ত হয়েছে। তদুপরি, ডেনমার্কের কিছু অংশ এবং ন্যাটোর সদস্য গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণকে সহজ করে তুলবে বলে দাবি করেন। এই ধরনের বিবৃতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশারদরা উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বিশ্বশান্তি ও আটলান্টিক চুক্তির মূল নীতির বিপরীতে এই ধরনের আক্রমণাত্মক নীতি দাঁড়িয়ে আছে। তারা জোর দিয়ে বলেন, শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশের ওপর জবরদস্তি না করে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা করা উচিত, আর বর্তমান ট্রাম্প সরকারের পদক্ষেপগুলো এই ঐক্যের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে; কিছু আইনসভা সদস্য কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছেন, অন্যদিকে কিছু সদস্য প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানকে সমর্থন করছেন। ভবিষ্যতে কংগ্রেসের তদারকি ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভূমিকা কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক নীতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে পুনর্গঠন করতে পারে, তবে একই সঙ্গে বহু দেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি ও সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও ইরানের সঙ্গে নতুন উত্তেজনা উদ্ভব হতে পারে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি-ভিত্তিক বিদেশ নীতি আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারকে চ্যালেঞ্জ করে, এবং ভেনেজুয়েলা অভিযানের মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন স্পষ্ট হয়েছে। এই নীতি দেশের অভ্যন্তরে ও বৈশ্বিক পর্যায়ে কী প্রভাব ফেলবে, তা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে থাকবে।



