যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ভিসা বন্ড ব্যবস্থা চালু করেছে, যা বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ভ্রমণের শর্ত কঠোর করবে। এই নীতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশে বসবাসের সময় বাড়িয়ে দেওয়া অনিয়মিত আচরণ রোধের উদ্দেশ্যে গৃহীত। ভিসা বন্ডের অর্থ হল আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে, যা ভিসা অনুমোদনের শর্তে অন্তর্ভুক্ত।
এম হুমায়ুন কবীর, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট, উল্লেখ করেন যে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপগুলোকে অপ্রত্যাশিত বলা যায় না। তিনি বলেন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময়ই তিনি বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কমাতে কঠোর নীতি অনুসরণ করার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। তাই ভিসা বন্ডের প্রয়োগকে তার পূর্ব ঘোষিত নীতির বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত।
ঢাকা ও ওয়াশিংটন ভিত্তিক কূটনৈতিক সূত্রগুলোও একই ধারণা ভাগ করে। তারা জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত সময় বসবাস এবং ভিসা শর্ত লঙ্ঘন করা সহ্য করা হবে না। এই সতর্কতা মূলত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধের দিকে লক্ষ্য রাখে।
ট্রাম্পের সরকার ৪ জানুয়ারি তার সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ এ ‘ইমিগ্রান্ট ওয়েলফেয়ার রিসিপিয়েন্ট রেটস বাই কান্ট্রি অব অরিজিন’ তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ ১৯ নম্বরে অবস্থান করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৫৪.৮ শতাংশ বাংলাদেশি পরিবার সরকারী সহায়তা গ্রহণ করে। এই তথ্য ভিসা বন্ড নীতির পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেখায় যে বাংলাদেশি অভিবাসীরা সামাজিক কল্যাণের উচ্চ ব্যবহারকারী।
ভিসা বন্ডের তালিকা প্রথমে গত বছরের আগস্টে ছয়টি দেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করে প্রকাশিত হয়। পরে আরও সাতটি দেশ যোগ করা হয়, এবং সর্বশেষে মঙ্গলবার বাংলাদেশসহ অতিরিক্ত ২৫টি দেশের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়। এই ধারাবাহিক সম্প্রসারণ নির্দেশ করে যে ট্রাম্পের সরকার ভিসা বন্ডকে একটি বিস্তৃত কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে, যা নির্দিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের উপর আর্থিক বাধ্যবাধকতা আরোপ করে।
এই নীতির ফলে বাংলাদেশি প্রবাসী ও তাদের পরিবারে সরাসরি প্রভাব পড়বে। ভিসা পেতে অতিরিক্ত আর্থিক জামানত প্রদান করতে হবে, যা বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বড় বোঝা হতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত ভ্রমণ, ব্যবসায়িক সফর এবং পারিবারিক মিলনমূলক সফর কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, ভিসা বন্ডের কঠোর শর্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ অনুসন্ধানকারী তরুণ প্রবাসীদেরও বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নীতি বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। রেমিট্যান্স দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৭% অবদান রাখে, এবং প্রবাসী পরিবারের আয় এই প্রবাহের মূল উৎস। ভিসা বন্ডের ফলে প্রবাসী কর্মী সংখ্যা কমে গেলে, রেমিট্যান্সের পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার সংকেত হতে পারে। যদি এই নীতি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে অন্যান্য দেশও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা বাড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও শ্রম বাজারে পরিবর্তন আসবে, এবং বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ভিসা বন্ড নীতি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য নতুন আর্থিক ও প্রশাসনিক বাধা সৃষ্টি করেছে। যদিও ট্রাম্পের সরকার এটিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করে, তবু এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রেমিট্যান্স, প্রবাসী সম্প্রদায় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর কী হবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



