ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বুধবার প্রেসিডেনশিয়াল অনার গার্ডের জেনারেল‑ইন‑কমান্ডার জাভিয়ের মারকানো তাবাতাকে পদচ্যুতি দেন। আদেশে কমান্ডারকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ পদে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে।
প্রেসিডেনশিয়াল অনার গার্ড হল এমন একটি সামরিক ইউনিট, যা রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকে এবং সরাসরি রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য দেহরক্ষী সরবরাহ করে। গার্ডের শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে মারকানো তাবাতার ভূমিকা ছিল প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং গার্ডের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী শনিবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একটি বিশেষ অভিযান চালায়। এই অভিযানে রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলা মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযানের পরপরই গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে মাদকসন্ত্রাস, মাদক পাচার এবং অস্ত্র সংরক্ষণ সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় মাদুরোর সন্তান এবং আরও তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মাদুরোর বাসভবনে মার্কিন অভিযান চলাকালীন কতজন নিহত হয়, তা সরকার এখনও প্রকাশ করেনি। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই মোট ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে গার্ডের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
মাদুরোর অপহরণের পর দেলসি রদ্রিগেজ, যিনি তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, সোমবারই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৫৬ বছর বয়সী রদ্রিগেজকে শাসনকারী দলের প্রতি আনুগত্য এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জন্য পরিচিত করা হয়।
ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত থাকলে ভাইস প্রেসিডেন্টই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধানের ধারা ২৩৩ ও ২৩৪ স্পষ্টভাবে বলে যে, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি সাময়িক হোক বা স্থায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্টই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করবেন। এই বিধান অনুসারে রদ্রিগেজের দায়িত্ব গ্রহণ আইনগতভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টও রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে নির্দেশ দেয়। একই সময়ে তিনি অর্থমন্ত্রী ও তেল মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছিলেন, যা তার ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়ে দেয় এবং শাসন কাঠামোর কেন্দ্রীয়করণকে নির্দেশ করে।
মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত রদ্রিগেজের এই পদক্ষেপকে কিছু বিশ্লেষক দেশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও গার্ডের নেতৃত্বে অবিশ্বাসের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। অন্যদিকে, শাসনকারী দল এটিকে দেশের শাসন সংহত করার এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
বহিরাগত পর্যবেক্ষকরা রদ্রিগেজের এই পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন পরিবর্তনের সূচক হিসেবে দেখছেন। গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারকে সরিয়ে দিয়ে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান, যা ভবিষ্যতে আরও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
মাদুরোর নিউইয়র্কে চলমান বিচারের ফলাফল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিধিকে প্রভাবিত করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যদি দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে শাসন কাঠামোর পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনঃনির্ধারণের সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদিকে, রদ্রিগেজের নেতৃত্বে সরকার কীভাবে এই আইনি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে, তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সারসংক্ষেপে, দেলসি রদ্রিগেজের গার্ডের কমান্ডার বরখাস্তের সিদ্ধান্ত ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি শাসন দলকে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কের পুনঃমূল্যায়নের দরজা খুলে দেবে। ভবিষ্যতে গার্ডের নতুন নেতৃত্বের নির্বাচন এবং রদ্রিগেজের নীতি দিকনির্দেশনা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠন করবে।



