যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে কেনা বা অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ফলে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উত্তর আটলান্টিকের বৃহত্তম দ্বীপটি ডেনমার্কের অংশ হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াইট হাউসের এই প্রস্তাবের ফলে দ্বীপের রাজনৈতিক পরিবেশ তীব্র উত্তেজনায় পরিণত হয়েছে।
নুকু শহরের ৩২ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মিয়া চেমনিটজ বলেন, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অধিগ্রহণে কোনো স্বার্থ দেখায় না এবং তারা নিজেদের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা বিক্রয়ের জন্য নেই।”
ওয়াইট হাউসের সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্পের দল গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডিক অধিকার কিনতে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে। এই প্রস্তাবটি ডেনমার্কের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির ভিত্তিতে করা হচ্ছে, যা শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করেছে।
ট্রাম্পের পূর্ববর্তী মন্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, প্রয়োজনে সামরিক জোর ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা সম্ভব। যদিও এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে, তবু যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে এই ধারণা এখনও সক্রিয়ভাবে বিবেচিত হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর কারাকাসে বাড়ি থেকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার সামরিক অপারেশন, যা মাদুরোর ওপর মাদক পাচার ও নরকো-সন্ত্রাসবাদী অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছিল, গ্রিনল্যান্ডের জনগণের মধ্যে ভয় বাড়িয়ে তুলেছে। এই অনন্য সামরিক হস্তক্ষেপের পরপরই গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের সম্ভাবনা আরও বাস্তবিক মনে হতে শুরু করে।
একজন হোয়াইট হাউস কর্মীর স্ত্রীর মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গ্রিনল্যান্ডই পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে। এই কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায়, কারণ তারা এখন এই বিষয়টি কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপান্তরিত হতে দেখছে।
৪০ বছর বয়সী তুপারনাক কোপেক, যিনি কানাডায় বসবাস করেন, জানান তিনি প্রথমবার তার গ্রিনল্যান্ডের বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সতর্ক করেন যে, যদি এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তার পরিবারকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। কোপেকের এই পদক্ষেপটি ট্রাম্পের সম্ভাব্য পরিকল্পনার প্রতি গ্রিনল্যান্ডের নাগরিকদের প্রস্তুতিমূলক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।
ডেনমার্কের পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডকে প্রতিনিধিত্বকারী দুইজন এমপি-র মধ্যে একজন আয়া চেমনিটজ, ট্রাম্পের মন্তব্যকে “স্পষ্ট হুমকি” হিসেবে বিবেচনা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই রকম আচরণকে “অত্যন্ত অসম্মানজনক” বলে সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ন্যাটো মিত্রকে অধিগ্রহণের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।
ভৌগোলিকভাবে গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে অধিকাংশ মানুষ নুকু ও তার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় শহরগুলোতে বসবাস করে। তবে দ্বীপের কৌশলগত অবস্থান, বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিকের সংযোগস্থল হওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গ্রিনল্যান্ডে উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এই উপস্থিতি মূলত আর্কটিকের শীতল বাতাসে শত্রু বিমান ও রকেটের প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা (early warning system) স্থাপনের জন্য। তাই গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব কেবল সম্পদ নয়, বরং সামরিক কৌশলগত দিক থেকেও বিশাল।
গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেনমার্কের সরকার ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নিতে পারে, যা ভবিষ্যতে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করবে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিকতা, ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সম্মতি বা বিরোধিতা কীভাবে বিকশিত হবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে। বর্তমান পর্যায়ে বিষয়টি এখনও আলোচনার স্তরে থাকলেও, গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা তাদের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে কাজ করার সংকল্প প্রকাশ করেছে।



