যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ৭ জানুয়ারি উত্তর আটলান্টিকের আন্তর্জাতিক জলে রাশিয়ার পতাকাবাহী তেল ট্যাংকার মারিনেরাকে জব্দ করেছে। ট্যাংকারটি পূর্বে বেলা‑১ নামে পরিচিত ছিল এবং গত মাসে রাশিয়ার রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ফলে ট্যাংকারটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।
রাশিয়ার আইনপ্রণেতা আন্দ্রেই কলিশাস ট্যাংকারের জব্দকে ‘পুরোদস্তুর জলদস্যুতা’ বলে নিন্দা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে, রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান।
রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়ও একই রকম অবস্থান গ্রহণ করে, ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইন (UNCLOS) অনুসারে কোনো দেশের অধিকার নেই অন্য দেশের নিবন্ধিত জাহাজে বল প্রয়োগের। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাজ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মারিনেরা ট্যাংকারের জব্দের আগে, মার্কিন নৌবাহিনী কয়েক দিন ধরে জাহাজটিকে অনুসরণ করে আসছিল। ট্যাংকারটি রাশিয়ার রেজিস্ট্রিতে নিবন্ধিত হওয়ার পরও, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে, কারণ তার মালিকানা ও পরিচালনায় ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়।
ট্যাংকারের জব্দের পর, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘প্রয়োজনীয়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া ও ইরানের তেল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এমন জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ‘বিশ্বের যেকোনো স্থানে’ কার্যকর থাকবে।
গত মাসে ভেনেজুয়েলার একটি তেল জাহাজের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের জব্দের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। সেই ঘটনায়ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জাহাজটি রাশিয়া ও ইরানের তেল পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করেন। এই প্রেক্ষাপটে, মারিনেরা ট্যাংকারের জব্দকে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন উত্তেজনা হিসেবে দেখছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের জাহাজ জব্দের ঘটনা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে পারস্পরিক বিরোধের উদাহরণ। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামুদ্রিক আইন সংক্রান্ত মতবিরোধ ভবিষ্যতে আরও জটিল কূটনৈতিক আলোচনার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উভয় পক্ষই এই ঘটনাকে কূটনৈতিকভাবে সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি আলোচনার সূচনা হয়নি। রাশিয়া আন্তর্জাতিক আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে।
ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির আইনপ্রণেতা কলিশাসের মন্তব্যে রাশিয়ার নৌবাহিনীর প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি রাশিয়ার সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে, নৌবাহিনীর জব্দের সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাহাজের মালিকানার স্বচ্ছতা ও নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের প্রমাণ উপস্থাপন করার কথা জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর, আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও বিশ্লেষকরা রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আলোচনা করছেন। বিশেষ করে, উভয় দেশের নৌবাহিনীর কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের পদ্ধতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই এই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক নোটিশ ও সম্ভবত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, এই ঘটনা সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।



