চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বুধবার থেকে শুরু করে এক সপ্তাহের মধ্যে ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, তানজানিয়া ও লেসোথোতে সফর করবেন, যার মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক আস্থা বাড়ানো এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ত্বরান্বিত করা। এই সফরটি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ভিত্তিতে নির্ধারিত এবং সোমবার শেষ হবে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওয়াং ই পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থিত এই চারটি দেশে ভ্রমণ করবেন, যেখানে তিনি উভয় দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলো আলোচনা করবেন। সফরের সময়সূচি অনুযায়ী, তিনি প্রথমে ইথিওপিয়ায় পৌঁছাবেন, তারপর সোমালিয়া, তানজানিয়া এবং শেষমেশ লেসোথোতে শেষ করবেন।
এই সফরটি চীনের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রীতি অনুসরণ করে, যেখানে প্রতি বছরের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফ্রিকায় যান। এই ঐতিহ্যগত পদ্ধতি চীনের আফ্রিকান অংশীদারিত্বকে দৃঢ় করার পাশাপাশি উভয় পক্ষের কূটনৈতিক সংলাপকে নিয়মিত রাখে।
মাও নিং, মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র, একটি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, বর্তমান সফরের লক্ষ্য হলো ‘সব পক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা গভীর করা এবং বিনিময় ও পারস্পরিক শেখা জোরদার করা’। তিনি আরও জানান, এই বৈঠকগুলোতে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চীন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ২০২৪ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ২৯৬ বিলিয়ন ডলার পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে চীনের বিশাল বিনিয়োগ, বিশেষ করে খনিজ সম্পদ, অবকাঠামো প্রকল্প এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতা রয়েছে।
বেইজিং ইতিমধ্যে আফ্রিকায় লক্ষাধিক কর্মী ও প্রকৌশলী পাঠিয়েছে, যারা তামা, স্বর্ণ, লিথিয়াম এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজের উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণে কাজ করছেন। এই কর্মশক্তি চীনের কৌশলগত সম্পদ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে অবদান রাখছে।
সোমালিয়ায় ওয়াং ইর সফরটি চীনের দরিদ্র হর্ন অব আফ্রিকা দেশটির প্রতি সমর্থনকে প্রকাশ করে। সোমালিয়া সরকার সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে সমর্থন চেয়েছে, এবং চীনের এই সফরটি সেই সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই সফরের সময়, সোমালিয়া সরকারের একটি বিবৃতি প্রকাশ পায়, যেখানে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সোমালিল্যান্ড সফরকে নিন্দা করা হয়েছে। সোমালিয়া এই সফরকে তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমর্থন দাবি করে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ২৬ ডিসেম্বর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ‘দৃঢ়ভাবে অবস্থান’ নিয়েছে বলে জানিয়েছে। এই অবস্থানটি চীনের আফ্রিকান অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখার কৌশলগত দিককে তুলে ধরে।
সোমালিয়া সফরের পর, ওয়াং ই তানজানিয়ায় যান, যেখানে অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের সময় এবং পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে রিপোর্ট পাওয়া যায়। তদুপরি, নির্বাচনের সময় সব প্রধান বিরোধী প্রার্থীর অযোগ্যতা ঘোষিত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তানজানিয়ায় ওয়াং ই নিরাপত্তা সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং খনিজ সম্পদে চীনের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের ‘অ-হস্তক্ষেপ’ নীতি উল্লেখ করে, তিনি উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই সফরটি চীনের আফ্রিকান বাজারে প্রভাব বাড়াবে, নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের সূচনা ঘটাবে এবং উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে। এছাড়া, সফরের ফলাফল তানজানিয়া ও সোমালিয়ার আসন্ন নির্বাচনী চক্রে রাজনৈতিক গতিবিধিকে প্রভাবিত করতে পারে।
সপ্তাহের শেষ দিনে, ওয়াং ই লেসোথোতে পৌঁছে সফর শেষ করবেন। লেসোথোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও, এই সফরটি চীনের আফ্রিকায় বিস্তৃত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



