দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাচীন শিলার গুহা থেকে পাওয়া পাঁচটি কুয়াটজ তীরের ডাঁটা ৬০,০০০ বছর পুরনো, এবং তাতে গিফবোল (Boophone disticha) নামের একটি ফুলের গাছের বিষের অবশিষ্টাংশ সনাক্ত হয়েছে। এই গাছকে “বিষাক্ত পেঁয়াজ” নামেও চেনা হয় এবং সাম্প্রতিক শতাব্দী পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী শিকারের মধ্যে ব্যবহার করা হতো। গবেষণার ফলাফল জানায় যে প্রাচীন মানুষদের শিকারের কৌশল প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে থেকেই বিষযুক্ত অস্ত্র ব্যবহার করে ছিল।
গিফবোলের বিষ মূলত অ্যালক্যালয়েড ভিত্তিক এবং তা তীরের পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র পরিমাণে লেগে থাকে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এই বিষের চিহ্ন তীরের পৃষ্ঠে এখনও রয়ে গেছে, যদিও সময়ের ক্ষয় রোধে তা খুব সূক্ষ্ম। তীরের ডাঁটা কুয়াটজের তৈরি, যা তীক্ষ্ণতা এবং টেকসইতার জন্য প্রাচীন শিকারের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল।
প্রথমে শিলার স্তরের ভূ-রাসায়নিক ও চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তীরের বয়স নিশ্চিত করা হয়। এরপর গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-ইলেকট্রন মাস স্পেকট্রোমেট্রি (GC‑MS) ব্যবহার করে তীরের পৃষ্ঠে থাকা অ্যালক্যালয়েডের স্বাক্ষর খোঁজা হয়। এই পদ্ধতি ১৮শ শতাব্দীর দক্ষিণ আফ্রিকায় সংগ্রহ করা বিষযুক্ত তীরের সঙ্গে তুলনা করে করা হয়, যা স্বাভাবিকভাবে গিফবোলের বিষের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল।
ফলাফল দেখায় যে আধুনিক সময়ের তীর এবং ৬০,০০০ বছর পুরনো তীর উভয়েই একই গিফবোলের বিষের চিহ্ন রয়েছে। যদিও দুইটি নমুনা সময়ের দিক থেকে বহু দশক পার্থক্যপূর্ণ, তবু একই রকম রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি স্পষ্ট। এটি নির্দেশ করে যে গিফবোলের বিষ ব্যবহার হয়তো একাধিকবার স্বাধীনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে, নাকি ধারাবাহিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
এই তীরের ডাঁটা ১৯৯০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকান প্রত্নতত্ত্ববিদ জোনাথন ক্যাপলান উমলাটুজানা শিলার গুহা থেকে উদ্ধার করেন। উমলাটুজানা গুহা বর্তমানের কওয়াজুলু-নাটাল প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত এবং প্রাচীন মানব বসতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। ক্যাপলানের অনুসন্ধানে এই তীরগুলো পাওয়া যায় এবং পরে আন্তর্জাতিক গবেষক দল তাদের বিশ্লেষণের জন্য সংগ্রহ করে।
গবেষক দলটি প্রথমে তীরের আবিষ্কৃত স্তরের বয়সকে পুনরায় নিশ্চিত করতে ভূ-রাসায়নিক ও চৌম্বকীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে। এরপর গিফবোলের বিষের স্বাক্ষর সনাক্ত করতে আধুনিক বিশ্লেষণাত্মক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়। একই সময়ে, ১৮শ শতাব্দীর সংগ্রহ করা বিষযুক্ত তীরের উপরও একই বিশ্লেষণ চালিয়ে গিফবোলের বিষের ধারাবাহিক উপস্থিতি প্রমাণ করা হয়।
এই ফলাফল পূর্বে জানা সবচেয়ে পুরনো বিষযুক্ত তীরের বয়সের সঙ্গে তুলনা করলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। পূর্বে সর্বশেষ ৭,০০০ বছরের কম বয়সের বিষযুক্ত তীরের রেকর্ড ছিল, আর এখন ৬০,০০০ বছরের তীরে একই বিষের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এই পার্থক্য প্রাচীন মানব সমাজের শিকারের কৌশলে এক বড় অগ্রগতি নির্দেশ করে।
গিফবোলের বিষ তাত্ক্ষণিক মৃত্যুর কারণ নয়; এটি শিকারের শিকারের পরে ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে। তাই শিকারের সময় শিকারীকে শিকারের পরে শিকারের গতি অনুসরণ করতে এবং শিকারের শিকারের অবস্থান নির্ণয় করতে হয়। এই ধরনের পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ প্রাচীন মানুষের জ্ঞানীয় জটিলতা এবং সামাজিক সমন্বয়ের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিষের ব্যবহার এবং শিকারের কৌশল উভয়ই প্রাচীন মানবের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রকাশ করে। তীরের ডাঁটা ও বিষের সংমিশ্রণ দেখায় যে শিকারের সরঞ্জাম কেবল শারীরিক নয়, রাসায়নিক দিক থেকেও উন্নত ছিল। এই আবিষ্কার মানবের প্রাথমিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের নতুন দিক উন্মোচন করে এবং প্রাচীন সমাজের জ্ঞানীয় স্তর সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
প্রাচীন শিকারের এই দিকটি ভবিষ্যতে আরও গবেষণার মাধ্যমে কীভাবে বিকশিত হয়েছে তা জানার জন্য অতিরিক্ত নিদর্শন ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। পাঠকরা কি মনে করেন, প্রাচীন মানবের শিকারের কৌশল আধুনিক শিকারের সঙ্গে তুলনা করলে কী ধরনের শিক্ষা দিতে পারে?



