ক্যাম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, চীন থেকে তিনজন নাগরিককে, যার মধ্যে ৩৭ বছর বয়সী চেন ঝি অন্তর্ভুক্ত, গ্রেফতার করে চীনের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। চেন ঝি একজন ধনী ব্যবসায়ী, যাকে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতির প্রধান দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে শ্রমিকদের জবরদস্তি করে অনলাইন স্ক্যাম চালিয়ে বিশ্বব্যাপী শিকারদের থেকে বিশাল পরিমাণ ডিজিটাল মুদ্রা চুরি করা হয়েছিল।
গ্রেফতারটি ৬ জানুয়ারি ঘটেছে, যখন ক্যাম্বোডিয়া ও চীনের যৌথ তদন্ত দল কয়েক মাসের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিনজন চীনা নাগরিককে আটক করে। চেন ঝি, শু জি লিয়াং এবং শাও জি হুই, সকলেই ক্যাম্বোডিয়ায় অবস্থিত স্ক্যাম ফার্মে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়।
মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউটররা চেন ঝির বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। অভিযোগ অনুসারে, চেন ঝি ক্যাম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত ইন্টারনেট স্ক্যামগুলোর মাধ্যমে বিলিয়ন ডলারের সমমানের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ তার নামে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিটকয়েন জব্দ করার দাবি করে, যা ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বিটকয়েন জব্দের মধ্যে একটি।
ইউকে সরকারও চেন ঝির গ্লোবাল ব্যবসা সমষ্টি, প্রিন্স গ্রুপের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রিন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট, আর্থিক ও ভোক্তা সেবা ইত্যাদি ব্যবসা উল্লেখ আছে, তবে গ্রুপের প্রতিনিধিরা পূর্বে স্ক্যাম কার্যক্রমে কোনো জড়িতি স্বীকার করেনি।
চেন ঝি অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযুক্ত হওয়ার পর থেকে তার অবস্থান অজানা ছিল। ক্যাম্বোডিয়ার সরকার জানিয়েছে, চেনের ক্যাম্বোডিয়ান নাগরিকত্ব গত মাসে রাজকীয় আদেশে বাতিল করা হয়েছে; তিনি ২০১৪ সালে চীনা নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ক্যাম্বোডিয়ান নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
প্রত্যর্পণের পর ক্যাম্বোডিয়ার মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, চেন ঝি কোথায় আটক ছিলেন তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে তিনি ও তার দুই সহযোদ্ধা চীনের আইনি ব্যবস্থার অধীন হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য চীনা আদালতে বিচারের মুখোমুখি হবে। ক্যাম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধের মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শত সহস্রাধিক মানুষ মানব পাচারের শিকার হয়, যার মধ্যে অনেকেই ক্যাম্বোডিয়ায় কাজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসেন এবং পরে জবরদস্তি করে অনলাইন স্ক্যাম ফার্মে বাধ্য করা হয়। এই ফার্মগুলোতে শিকারেরা শারীরিক নির্যাতন বা হুমকির মুখে বসে অপরিচিতদের আর্থিক সম্পদ চুরি করে। শিকারের বেশিরভাগই চীনা নাগরিক, তবে অন্যান্য জাতীয়তার লোকজনও এতে জড়িত।
ক্যাম্বোডিয়ার সরকার এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে এবং মানব পাচার ও অনলাইন জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী। ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধের তদন্তে আরও স্বচ্ছতা ও দ্রুত পদক্ষেপের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যাম্বোডিয়ার আইনি ব্যবস্থা ও মানব পাচার বিরোধী নীতির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, চেন ঝির মতো উচ্চপ্রোফাইল অপরাধীর প্রত্যর্পণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মডেল হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ক্যাম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে এই ধরনের স্ক্যাম ফার্মের কার্যক্রম রোধে কঠোর নজরদারি চালিয়ে যাবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।



