বাংলাদেশের স্পিনার, গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শিল্পের প্রতিনিধিরা আজ ঢাকায় বাংলাদেশ ট্রেড ও ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিএ) অধীনে একত্রিত হয়ে ১০০% কটন ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্নের ২০-৩০ কাউন্টের ওপর প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ সুরক্ষা শুল্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। স্পিনাররা এই শুল্ককে দেশীয় উৎপাদন রক্ষা ও বিদেশি ডাম্পিং রোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বলে দাবি করছেন, আর গার্মেন্টস রপ্তানিকারকরা শুল্কের ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা হ্রাস পাবে বলে বিরোধিতা করছেন।
স্থানীয় স্পিনার সংস্থাগুলি বিটিটিএকে ১০০% কটন ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্নের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, ভারত থেকে সস্তা ইয়ার্নের ঢালু প্রবাহ দেশীয় বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এই শুল্ক না থাকলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা মূল্য হ্রাসের মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকিএমইএ) স্পিনারদের প্রস্তাবের কঠোর বিরোধে রয়েছে। তারা জানিয়েছে যে, শুল্ক আরোপের ফলে ইয়ার্নের দাম বাড়বে, ফলে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে।
স্পিনাররা শেষ সপ্তাহে প্রকাশ করেছে যে, ভারত থেকে সস্তা ইয়ার্নের ডাম্পিং তাদের বাজারে প্রবেশের মূল কারণ। তারা দাবি করেছে যে, বর্তমানে দেশের গুদামে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন টাকার (১২,০০০ কোটি টাকা) অমিলিত স্টক রয়েছে, যা বিক্রি না হলে শিল্পের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়বে।
তাছাড়া, দেশীয় স্পিনাররা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছে যে, তারা ১০০% কটন ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্নের সম্পূর্ণ জাতীয় চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এতে পলিয়েস্টার-কটন (PC), সিভি-সি (CVC), পলিয়েস্টার-ভিসকোস (PV) এবং গ্রে মেলাঞ্জের মতো বিভিন্ন ধরণের ইয়ার্ন অন্তর্ভুক্ত। তাদের মতে, যথাযথ নীতি সমর্থন পেলে দেশীয় উৎপাদন সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) স্পিনারদের সঙ্গে সমন্বয় করে অতিরিক্ত একটি দাবি উপস্থাপন করেছে; তারা প্রস্তাবিত ইয়ার্নের জন্য বন্ডেড গুদাম সুবিধা বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। এই সুবিধা বাতিল হলে স্পিনারদের নগদ প্রবাহে স্বস্তি হবে এবং বাজারে অতিরিক্ত স্টক কমে যাবে বলে তারা যুক্তি দিয়েছে।
বিটিটিএ আজকের বৈঠকে স্পিনার, গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে শুল্কের প্রভাব, ডাম্পিং নিয়ন্ত্রণ এবং গুদাম নীতি নিয়ে মতবিনিময় করেছে। এই বৈঠকটি পূর্বে একই সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একটি সেশনের ধারাবাহিক, যেখানে প্রস্তাবিত সুরক্ষা শুল্কের মূল দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছিল।
বিজিএমইএ ও বিকিএমইএ উভয় সংস্থা বিটিটিএকে লিখিত চিঠিতে জানিয়েছে যে, ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি আয়কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা উল্লেখ করেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য সংবেদনশীল গ্রাহকদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়বে।
এই চিঠিগুলিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা উন্নত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। শিল্পের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন যে, বিদ্যুৎ ঘাটতি ও গ্যাসের উচ্চ দাম উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, ফলে শুল্কের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা সরকারকে উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনা ও সহায়তা প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, শুল্ক আরোপের ফলে দেশীয় স্পিনারদের জন্য স্বল্পমেয়াদে রপ্তানি মূল্যের চাপ বাড়তে পারে, তবে গার্মেন্টস শিল্পের রপ্তানি আয় হ্রাস পেলে সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে পারে। এছাড়া, ডাম্পিং রোধে শুল্কের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি সরকার শুল্কের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে কাঠামোগত উন্নতি না করে, তবে উভয় সেক্টরেরই উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা হারাবে। অন্যদিকে, ডাম্পিং রোধে কার্যকর নীতি গ্রহণ করলে দেশীয় স্পিনারদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ভিত্তিক গার্মেন্টস শিল্পের জন্য স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, স্পিনার ও গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের মধ্যে সুরক্ষা শুল্ক নিয়ে মতবিরোধ অব্যাহত, এবং সরকারকে উভয় সেক্টরের চাহিদা সমন্বয় করে নীতি নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।



