যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বুধবার ঘোষণা করেছে যে তারা ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ চীনের দিকে থেকে সরিয়ে, নিষিদ্ধ তেলকে যুক্তরাষ্ট্রে আনতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এই পদক্ষেপটি ভেনেজুয়েলার তেল রিজার্ভের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান শাসন দল, নিকোলাস মাদুরোর সোসিয়ালিস্ট পার্টির মিত্রদের সমর্থনে, এখনও ক্ষমতায় রয়েছে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ মাদুরোর অপসারণের পর দেশকে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা শুরু করার চেষ্টা করছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ব্লকেডে আটকে থাকা ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল শোধন ও বিক্রি করবে, যা প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ট্রাম্পের অফিসিয়াল টুইটে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে তেল বাজার মূল্যে বিক্রি হবে এবং তার নেতৃত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উপকারে ব্যবহৃত হবে। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক তেল বাজারে প্রায় এক শতাংশ হ্রাস দেখা গিয়েছে, যা বাড়তি সরবরাহের প্রত্যাশা থেকে উদ্ভূত।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্র তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সূত্র অনুযায়ী, রপ্তানি চুক্তির আলোচনা অগ্রসর হয়েছে, যদিও সরকার এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে রপ্তানি হওয়া তেল কার্গো পুনঃনির্দেশ করা হতে পারে, কারণ কারাকাস এখনো ট্যাঙ্কার ও গুদামে আটকে থাকা তেল মুক্ত করতে চায়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বুধবার একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘বুলি’ হিসেবে বর্ণনা করে, এবং বলেছে যে এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের গুরুতর হস্তক্ষেপ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রচেষ্টাকে নিন্দা করেছেন।
চীনা সরকার এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে। ভেনেজুয়েলা থেকে চীনের সর্ববৃহৎ তেল ক্রেতা হিসেবে চীন, এখনো এই রুটের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বিশ্ব তেল বাজারে এই চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির ঐতিহ্যগত প্রবাহকে পরিবর্তন করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম ও সরবরাহের গতি পরিবর্তন করতে পারে। তবে তাত্ক্ষণিকভাবে তেলের দামের হ্রাস মূলত বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের আশার ফলে ঘটেছে।
ভেনেজুয়েলার সরকার এখনও চীনের সঙ্গে চলমান তেল চুক্তি রদ করার কোনো স্পষ্ট সংকেত দেয়নি, তবে রড্রিগেজের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত। এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেল রিজার্ভের ব্যবহার ও বিক্রয় কিভাবে পরিচালিত হবে তা আন্তর্জাতিক নজরে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে, কারণ মাদুরোর সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে দেশের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্পের জন্য নতুন বাজারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যদিও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আইনি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
চীনের নিন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিকল্পনা উভয়ই ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ তেল নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পরবর্তী সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর বা ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই বিকাশের পরবর্তী ধাপগুলোতে ভেনেজুয়েলার তেল রিজার্ভের ব্যবহার, যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধন ক্ষমতা, এবং চীনের বিকল্প সরবরাহ পথের নির্ধারণ মূল বিষয় হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, এই তেল চুক্তি জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।



