এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড আগামীকাল, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার থেকে দেশব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের বিক্রি ও সরবরাহ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। সমিতি দাবি করেছে যে, বকেয়া অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের সব ধরণের লেনদেন বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের চাহিদা পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
সমিতি আজ সন্ধ্যায় দেশের সকল গ্যাস পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের উদ্দেশ্যে একটি নোটিশ প্রকাশ করেছে। নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সব গ্যাস কোম্পানির প্লান্ট থেকে এলপিজি উত্তোলনও একই সঙ্গে বন্ধ থাকবে। ফলে উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলে থামা ঘটবে।
এই পদক্ষেপের পূর্বে, সমিতি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে তাদের দাবি তুলে ধরেছে। সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যের পুনঃনির্ধারণ প্রয়োজন এবং পরিবেশকদের উপর আরোপিত জরিমানা ও হয়রানি বন্ধ করা উচিত।
সমিতির মূল চাহিদা তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, বিইআরসি নতুন মূল্য কাঠামো নির্ধারণ করে গ্যাসের দামকে বাস্তবিক খরচের সাথে সামঞ্জস্য করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশকদের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ফি ও জরিমানা বাতিল করতে হবে। তৃতীয়ত, গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউশন চেইনে জড়িত সকল পক্ষের কমিশন বাড়িয়ে পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে ৭৫ টাকা করতে হবে।
সমিতি এই তিনটি দাবি পূরণ না হলে, তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের নোটিশ কার্যকর করবে বলে জানিয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বজায় থাকবে।
একজন জ্বালানি উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন যে, সাম্প্রতিক সময়ে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা গ্যাসের দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের অতিরিক্ত বোঝা বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি বিভাগ, বিইআরসি এবং এলপিজি কোম্পানিগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপই সমস্যার সমাধান হতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবেশকদের উপর অতিরিক্ত চাপ আরোপ করা হচ্ছে।
বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের ফলে গ্যাসের শৃঙ্খলে তীব্র ব্যাঘাত ঘটবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে গ্যাসের উত্তোলন বন্ধ হলে, রিফিল স্টেশনগুলো দ্রুতই শূন্যে পৌঁছাবে এবং গ্রাহকদের গ্যাসের অভাবের মুখোমুখি হতে হবে।
গৃহস্থালী ব্যবহারকারীদের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে, কারণ গ্যাসের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে শীতকালে গরমের জন্য গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো তীব্র অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে।
বাজারে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিলে কালো বাজারের সম্ভাবনা বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। অনিয়ন্ত্রিত দামের মাধ্যমে গ্যাস বিক্রি করা হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ক্ষতি বাড়াবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি, তবে পূর্বের উদাহরণে দেখা গেছে যে, এধরনের বিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিইআরসি দ্রুত হস্তক্ষেপ করে সমঝোতা করার চেষ্টা করে। তাই আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতা সম্ভব হতে পারে।
বাজারে গ্যাসের দাম স্থিতিশীল না থাকলে, অন্যান্য জ্বালানি উৎসের চাহিদা বাড়তে পারে, যা বিদ্যুৎ ও কৌড়ি গ্যাসের দামের ওপরও প্রভাব ফেলবে। ফলে সামগ্রিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, যদি সমিতির দাবিগুলো পূরণ না হয়, তবে গ্যাস শিল্পে বিনিয়োগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নতুন বিনিয়োগকারী ও বিদ্যমান কোম্পানিগুলো মূল্য নির্ধারণ, কমিশন কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক নীতিমালা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
সারসংক্ষেপে, এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দেশের গ্যাস বাজারে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে দাবিগুলো পূরণ না হলে, গ্যাসের ঘাটতি, দাম বৃদ্ধি এবং কালো বাজারের উত্থান ঘটতে পারে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ এই সংকটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



