পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে তীব্র শীতলতা এবং ভারী তুষারপাতের ফলে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে জমে থাকা বরফ রাস্তায় এবং বিমানবন্দরে গতি কমিয়ে দিয়েছে, ফলে বহু ফ্লাইট বাতিল এবং রেল সেবা দেরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি বুধবার থেকে তীব্রভাবে অব্যাহত রয়েছে এবং ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা ও চলাচলকে কঠিন করে তুলেছে।
বিভিন্ন দেশের প্রধান বিমানবন্দরে একাধিক শতাধিক ফ্লাইট বাতিলের খবর জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের শিপহল বিমানবন্দরে একক দিনে ৭০০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যা অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাবের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। একই সময়ে ফ্রান্সের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি প্যারিসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নির্ধারিত ফ্লাইটের ৪০% কমানোর নির্দেশ দিয়েছে।
শিপহল বিমানবন্দরে তুষার ও বরফের পরিমাণ অতিরিক্ত হওয়ায় ডি-আইসিং তরলের সরবরাহ প্রায় শেষের দিকে পৌঁছেছে। নেদারল্যান্ডসের জাতীয় এয়ারলাইন KLM এই সংকট সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে বলেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী শীতল অবস্থার ফলে ডি-আইসিং তরলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এয়ারপোর্টের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে, এক হাজারেরও বেশি যাত্রী রাতারাতি বিমানবন্দরে আটকে গেছেন এবং তাদের জন্য নিরাপদ শয়নস্থান ও খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শিপহলের পরিস্থিতি ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত দেরি ও বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে। এয়ারপোর্টের কর্মকর্তারা জানান, নিরাপত্তা চেকের আগে ও পরে কয়েকশো শয্যা স্থাপন করা হয়েছে এবং যাত্রীদের জন্য খাবার ও পানীয় সরবরাহ করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা যদিও অস্থায়ী, তবু তা যাত্রীদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে।
ফ্রান্সে প্যারিসের চার্লস দে গল এবং ওরলি বিমানবন্দরে যথাক্রমে ১০০টিরও বেশি এবং ৪০টিরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এই বাতিলের ফলে প্যারিসে আন্তর্জাতিক ও গৃহস্থালি ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফ্রান্সের বেশিরভাগ অঞ্চলেই তীব্র তুষার এবং কালো বরফের সতর্কতা জারি করা হয়েছে, ফলে কিছু এলাকায় ট্রাকের চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইংল্যান্ডের হিথ্রো এবং বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বিমানবন্দলেও বহু ফ্লাইট দেরি ও বাতিলের রিপোর্ট পাওয়া গেছে। উভয় বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে যে, তুষার ও বরফের কারণে রানওয়ে পরিষ্কার করা কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে উড্ডয়ন ও অবতরণে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
ইউরোস্টার রেল পরিষেবাও প্রভাবিত হয়েছে; লন্ডন ও প্যারিসের মধ্যে চলা কিছু ট্রেন দেরি বা বাতিল হয়েছে। রেল সংস্থার মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, তুষারপাতের ফলে রেলপথে স্লিপেজের ঝুঁকি বাড়ে, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ডে তীব্র তুষার ও কালো বরফের সতর্কতা জারি করা হয়েছে, ফলে লজিস্টিক্স ও পণ্য পরিবহনে বড় ধাক্কা লেগেছে। কিছু অঞ্চলে ট্রাক চালকদের জন্য রাস্তায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যাতে দুর্ঘটনা কমে। লেভার শহরের একটি সেবাস্থলে এক ট্রাক চালক বলেছিলেন, “রাস্তায় আটকে যাওয়ার চেয়ে এখানে থাকা নিরাপদ,” এবং তিনি এই মন্তব্যটি স্থানীয় সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে জানিয়েছেন।
এই সপ্তাহে শীতলতার ফলে ইউরোপ জুড়ে মোট ছয়জনের মৃত্যু ঘটেছে। ফ্রান্সে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে দু’টি আলাদা অঞ্চলে বিপজ্জনক ড্রাইভিং পরিস্থিতির কারণে প্রাণ হারিয়েছেন। বালকান দেশের বসনিয়ায়ও এক নারী ৪০ সেন্টিমিটার তুষারপাতের পর গাড়ি চালানোর সময় মারা গেছেন। এই ঘটনাগুলি শীতলতার সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পরিবহন সংস্থা (IATA) এর বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন যে, এই ধরনের হিমবাহের প্রভাব ইউরোপীয় বিমান চলাচলে মৌসুমী চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং এয়ারলাইনগুলোকে জরুরি প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন মন্ত্রণালয় শীতলতার পূর্বাভাস অনুযায়ী অতিরিক্ত ডি-আইসিং তরল ও রোড স্যাল্টের সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বিমান ও রেল সংস্থাগুলো অতিরিক্ত দেরি ও বাতিলের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে চলেছে। ভ্রমণকারীদের অনুরোধ করা হচ্ছে যে, যাত্রা পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করে, সম্ভব হলে বিকল্প রুট বা সময়সূচি ব্যবহার করুন এবং সর্বশেষ আপডেটের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার ওয়েবসাইটে নজর রাখুন। শীতলতার তীব্রতা কমে গেলে পরিষেবা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা জরুরি।



