প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বুধবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ২০২৬‑২০৫০ মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনাটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রস্তুত করেছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষতা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত।
মন্ত্রণালয় পরিকল্পনার মূল দিক হিসেবে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। একইসাথে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির জন্য নতুন প্রযুক্তি ও অবকাঠামোকে ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা সভায় জ্বালানি‑বিদ্যুৎ গবেষণার জন্য পৃথক সংস্থা গঠনের নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা না থাকলে নীতি‑নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল থাকবে এবং ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়বে।
সভায় উপস্থিত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানরা পূর্বের তিনটি মহাপরিকল্পনার নীতিগত ফাঁকগুলো চিহ্নিত করে সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করেন। পূর্বের পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নে দেখা গ্যাপগুলোকে নতুন কৌশলের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
নতুন মহাপরিকল্পনা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে: প্রথম পর্যায় ২০২৬‑২০৩০, দ্বিতীয় পর্যায় ২০৩০‑২০৪০ এবং তৃতীয় পর্যায় ২০৪০‑২০৫০। প্রতিটি ধাপের লক্ষ্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট অবকাঠামো ও প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে জ্বালানি সেক্টরের রূপান্তর ঘটানো।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পের মধ্যে অফশোর গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন, বৃহৎ পরিসরের রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া ভিত্তিক শক্তি অবকাঠামো, ভূ‑তাপীয় (জিওথার্মাল) শক্তি এবং জোয়ার‑ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক নবায়নযোগ্য শক্তি অন্তর্ভুক্ত। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দেশীয় জ্বালানি উৎসের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, “শক্তি খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতের শক্তি ও স্থিতিশীলতা সরাসরি প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মানকে প্রভাবিত করে।” তিনি অতীতের ভুলগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে নীতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
উল্লেখযোগ্য যে, তিনি পুনরাবৃত্তি করেন, “একই পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট নয়; ভুল লোকেশন ও কাঠামোতে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলোকে পুনর্বিবেচনা করে একটি স্বচ্ছ, নিয়ম‑ভিত্তিক গবেষণা কাঠামো গঠন করা জরুরি।” এ জন্য গবেষণা কেন্দ্রের দ্রুত প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য বলে তিনি জোর দেন।
মন্ত্রণালয় পরিকল্পনায় জ্বালানি খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাসের উপায় তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে, এই রূপান্তর থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, ট্রান্সমিশন, সরবরাহ চেইন, পরিবেশগত ও আর্থিক টেকসইতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এসব সুপারিশের লক্ষ্য হল ২০৫০ সালের মধ্যে প্রাইমারি এনার্জি সেক্টরকে নিরাপদ, দক্ষ, কম আমদানিনির্ভর এবং আর্থিকভাবে টেকসই করা।
সভায় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রধান কর্মকর্তা, পরিকল্পনা বিভাগীয় প্রধান, এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা। সকল অংশগ্রহণকারী একমত হন যে, নতুন মহাপরিকল্পনা এবং গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তুলবে।



