অস্ট্রেলিয়ার সরকার বুধবার আপডেট করা ভ্রমণ সতর্কবার্তায় ইরানে বসবাসরত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের দ্রুত দেশ ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে। সতর্কতা অনুযায়ী, ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংস বিক্ষোভের ঝুঁকি বাড়ার কারণে নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ইরানে অবস্থিত অস্ট্রেলীয়দের যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে বেরিয়ে আসা উচিত, কারণ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং পূর্বাভাস ছাড়াই তীব্রতর হতে পারে। এই সতর্কতা ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে জারি করা হয়েছে।
ইরানে টানা দশ দিন ধরে চলমান প্রতিবাদে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) অনুযায়ী অন্তত ৩৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৪ জন ছিলেন বিক্ষোভকারী এবং দুইজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। ইরানি সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করেনি; তারা কেবল তিনজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে। একই সময়ে, বিবিসি পার্সিয়ান ২০ জনের নাম ও মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বিক্ষোভের ফলে ৬০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী আহত হয়েছে এবং প্রায় ২,০৭৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি মিডিয়া জানিয়েছে, পশ্চিম ইলামের মালেকশাহি জেলায় একটি পুলিশ সদস্য গুলিতে নিহত হয়েছে, যেখানে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন অভিযান চালু রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্যান্য দেশও অনুসরণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডা ইতিমধ্যে অনুরূপ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে তাদের নাগরিকদের ইরান থেকে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছে। এক কূটনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “ইরানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো সমন্বিতভাবে নাগরিক সুরক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
ইরানের সরকার বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সংকটকে তুলে ধরেছে, যা দেশের ৩১টি প্রদেশের অধিকাংশে প্রভাব ফেলেছে। তবে, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছ থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে চলমান আলোচনার সময়।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানে থাকা অস্ট্রেলীয়দের নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং তাই দ্রুত প্রস্থান করা সর্বোত্তম। মন্ত্রণালয় এছাড়াও জরুরি সহায়তা ও পুনরায় প্রবেশের জন্য কনসুলার সেবা প্রদান করবে বলে জানিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এখনও বিক্ষোভের সঠিক সংখ্যা ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রকাশ করেনি, যা তথ্যের স্বচ্ছতায় প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা না থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাস হ্রাস পেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
বিকাশের দিক থেকে, যদি বিক্ষোভের তীব্রতা অব্যাহত থাকে, তবে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে, যা তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছ থেকে আরও কঠোর সমালোচনা ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার এই সতর্কতা ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অঞ্চলের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যতে, ইরানের সরকার যদি বিক্ষোভের মূল চাহিদা—অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা—সমাধান না করে, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও দেশ নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, অস্ট্রেলিয়ার কনসুলার কর্মীরা ইরানে থাকা নাগরিকদের জন্য নিরাপদ রুট ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা চালু করেছে। একই সঙ্গে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি শমনের চেষ্টা করা হবে, যদিও বর্তমান অবস্থা তীব্রতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।



