জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বুধবার (৭ জানুয়ারি) তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে পোস্ট করে জানিয়েছেন যে, তার নির্বাচনি হলফনামায় উল্লেখিত আয় ও সম্পদ সম্পর্কে চলমান প্রচারণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার এবং স্বচ্ছ রাজনীতিবিদকে সন্দেহের গণ্ডিতে টানার চেষ্টা।
তিনি উল্লেখ করেন, হলফনামায় উল্লেখিত বারো লক্ষ টাকা বার্ষিক আয় কোনো হঠাৎ পাওয়া অর্থ নয়; এটি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত আর্থিক বছরের মোট আয়। এই সময়ের প্রায় সাত মাস তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারী বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন।
উল্লেখিত বারো লক্ষ টাকার মধ্যে প্রায় এক লক্ষ একানব্বই হাজার টাকা উপদেষ্টা পদ থেকে প্রাপ্ত বেতন ও ভাতা, যা ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধিত, আয়করযোগ্য এবং সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত। অবশিষ্ট অংশটি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর একটি বেসরকারি সংস্থায় পরামর্শক হিসেবে কাজের পারিশ্রমিক থেকে এসেছে, যার কর হিসাবও স্বচ্ছভাবে জমা হয়েছে।
সম্পদের মোট মূল্য ৩২ লক্ষ টাকা হিসেবে ঘোষিত হয়েছে, যা এক বছরের আয় নয়, বরং প্রায় বিশ সাত বছরের সঞ্চয়ের সমষ্টি। এই পরিমাণে বেতন থেকে সঞ্চয়, পূর্ববর্তী সেভিংস, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রাপ্ত উপহার, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর কর পরিশোধিত আয়ও এতে গণনা করা হয়েছে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত গুজবের প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের সময় তার অ্যাকাউন্টে প্রায় দশ হাজার টাকা থাকা তার মোট সম্পদের প্রতিফলন নয়; এটি কেবল সেই মুহূর্তের অবশিষ্ট নগদ। পরবর্তীতে মন্ত্রীদের আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য সরকারী বরাদ্দ অর্থ একই অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ায় ব্যালেন্স বৃদ্ধি পেয়েছে, যা হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
বর্তমানে নাহিদ ইসলামের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে; একটি সোনালী ব্যাংকে এবং অন্যটি অন্য কোনো ব্যাংকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অ্যাকাউন্টগুলোতে থাকা অর্থ সম্পূর্ণভাবে তার ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কোনো অস্বচ্ছ লেনদেনের সূচক নয়।
নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য হল তার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, যাতে তার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়। তিনি যুক্তি দেন, যদি সত্যিকারের তথ্য প্রকাশের ইচ্ছা থাকে, তবে তা হলফনামার তথ্যের ভিত্তিতে করা হতো, না যে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে।
এই বিবৃতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে নাহিদ ইসলামের উপদেষ্টা পদকালীন বেতন ও পরামর্শক ফি-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যদিও তিনি সব লেনদেনের কর রেকর্ড প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই বিতর্কের ফলে এনসিপি নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে ভোটারদের আয়-সম্পদ স্বচ্ছতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। তবে নাহিদ ইসলামের দাবি যে প্রচারণা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ, তা যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা বিরোধী পার্টির ওপর নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করতে পারে।
অধিকন্তু, নাহিদ ইসলামের পোস্টে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, তার আর্থিক হিসাব সরকারী নিয়ম মেনে চলা হয়েছে এবং সব আয়কর দায়িত্ব পূরণ করা হয়েছে। এই দিকটি ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেন, যদি নাহিদ ইসলামের ব্যাখ্যা সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে এটি নির্বাচনী হলফনামার স্বচ্ছতা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করবে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্যও রেফারেন্স পয়েন্ট তৈরি করবে।
অন্যদিকে, বিরোধী গোষ্ঠী এখনও নাহিদ ইসলামের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং আরও তথ্যের দাবি জানায়। তারা দাবি করে, সম্পদের মোট পরিমাণ এবং ব্যাংক ব্যালেন্সের পার্থক্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম শেষ পর্যন্ত বলেন, তিনি সবসময় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সত্যিকারের তথ্যের ভিত্তিতে ভোটাররা তার প্রতি ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়ন করবেন।
এই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় আর্থিক স্বচ্ছতা, নির্বাচনি হলফনামার যথার্থতা এবং মিডিয়া প্রচারণার প্রভাব নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনবে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই বিতর্কের সমাধান হবে এবং তা ভোটারদের মনোভাবকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজরে থাকবে।



