অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বুধবার ঢাকা শহরের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দশটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একত্রিত হন। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভুক্তি নিয়ে আলোচনা করা এবং বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি করা।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল অনুযায়ী, লাভজনক দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে অন্তর্ভুক্ত করে মূলধন সংগ্রহের নতুন পথ তৈরি করা হবে। এই নীতি বাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ানোর লক্ষ্যে গৃহীত।
বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা এবং ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এর চেয়ারম্যান আবু আহমেদ উপস্থিত ছিলেন এবং উভয় পক্ষের মতবিনিময় সরাসরি শেয়ার তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল।
সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্তি (ডাইরেক্ট লিস্টিং) পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আনা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদ্ধতি দ্রুত মূলধন সংগ্রহের সুযোগ দেয় এবং তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার জটিলতা কমায়।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে, তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের বোর্ড মিটিংয়ের মাধ্যমে গৃহীত হবে। সরকার এই সংস্থাগুলোর শেয়ার বাজারে প্রবেশে সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রয়োজন।
বৈঠকে আলোচিত দশটি প্রতিষ্ঠান হল: কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি।
বৈঠকের শেষে অর্থ উপদেষ্টা শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, “বাজার এখন আইনের সীমার মধ্যে রয়েছে, তবে গভীরতা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে পদক্ষেপ জরুরি।” তিনি শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা ও লিকুইডিটি উন্নত করার জন্য সরকারী ভাল মৌলিক ভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার ‘অফলোড’ করার পরিকল্পনা উল্লেখ করেন।
মালিকানাধীন বহুজাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে তিনি জানান, সরকারও তাদের শেয়ার ধারণ করে আছে, তবে এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি। ভবিষ্যতে তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে, তবে তা কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া সম্পন্ন হবে না।
প্রক্রিয়ার সূচনা সম্পর্কে প্রশ্নে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “প্রক্রিয়া শুরু হবে, তবে কোম্পানিগুলো তাদের বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া এগোতে পারবে না। সরকার ইতিমধ্যে সম্মতি প্রদান করেছে।” এই মন্তব্য পূর্ববর্তী আলোচনার তুলনায় স্পষ্ট পরিবর্তন নির্দেশ করে।
পূর্বে একই ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বাস্তবায়ন সীমিত ছিল। অর্থ উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, “এবার মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে সম্মতি দিয়েছে, তাই আমরা দ্রুত কাজ শুরু করতে পারি।” তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কোম্পানি আইনকে উপেক্ষা করা যায় না, তাই প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে।”
শেয়ারবাজারে নতুন তালিকাভুক্তি বাজারের মোট মূলধন বাড়াবে, লিকুইডিটি বৃদ্ধি করবে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। একই সঙ্গে, তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার সময় কোম্পানিগুলোকে কঠোর আর্থিক ও শাসন সংক্রান্ত মানদণ্ড মেনে চলতে হবে, যা স্বল্পমেয়াদে অতিরিক্ত খরচের সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, সরকারী ও বহুজাতিক উভয় ধরনের সংস্থার তালিকাভুক্তি বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে এবং দেশের মূলধন বাজারকে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সহায়তা করবে। তবে অতিরিক্ত তালিকাভুক্তি যদি যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া হয়, তবে বাজারে অতিরিক্ত উত্থান-পতন এবং মূল্যবৃদ্ধি ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
সংক্ষেপে, সরকার শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়াতে এবং আস্থা পুনরুদ্ধার করতে বড় কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করেছে। প্রক্রিয়ার সফলতা নির্ভর করবে কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদন, আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলা এবং বাজারের স্বচ্ছতা বজায় রাখার উপর। এই পদক্ষেপগুলো যদি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের মূলধন বাজারের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে।



