মার্চের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করে, যার ফলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রাপ্তির শর্তে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে এখন ভিসা আবেদনকারীদের জন্য নিরাপত্তা বন্ড জমা দিতে হবে, যা পূর্বে প্রযোজ্য নয় এমন দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এই পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অভিবাসন নীতি কঠোর করার ইচ্ছা উল্লেখ করা হয়েছে। বন্ড তালিকায় যুক্ত হওয়া মানে হল, আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক জামানত প্রদান করতে হবে, যা ভিসা অনুমোদন না হলে ফেরত না দিয়ে জব্দ করা হবে। এই শর্তটি মূলত ভিসা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার না করা বা ওভারস্টে করার ঝুঁকি কমাতে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনকে দেশের বহিরাগত কর্মসংস্থান ও শিক্ষার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী ছাত্র এবং বৈধ কর্মসংস্থান খোঁজা শ্রমিকদের জন্য এই নতুন শর্ত অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করতে পারে। মন্ত্রণালয় বলেছে, সরকার সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি পরিবর্তনকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নায়জেরিয়া, পাকিস্তান এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর নাগরিকদের জন্যও অনুরূপ বন্ড শর্ত প্রয়োগ করেছে। এই দেশগুলোতে একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের পর ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার গতি ধীর হয়েছে এবং আবেদনকারীর সংখ্যা কমেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশও এই কঠোর নীতির পেছনে ভূমিকা রাখে। হাউস এবং সেনেটের কিছু সদস্য ভিসা নীতি শিথিল করার দাবি তুলেছেন, তবে নিরাপত্তা সংস্থার সতর্কতা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা এই আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংস্থা এই পরিবর্তনকে রপ্তানি ও আমদানি কার্যক্রমের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোকে কর্মী ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ু এবং অতিরিক্ত ব্যয় মোকাবেলা করতে হবে, যা লজিস্টিক্স এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে।
দূতাবাসের সূত্র অনুযায়ী, বন্ডের পরিমাণ আবেদনকারীর পেশা, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং পূর্বের ভিসা রেকর্ডের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হবে। সাধারণত, বন্ডের পরিমাণ কয়েক হাজার ডলারের সমান হতে পারে, যা অনেক আবেদনকারীর জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক বাধা হতে পারে।
এই নীতি পরিবর্তনের পর, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশ থেকে আসা আবেদনকারীর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে বলে প্রথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে, কিছু সংস্থা ইতিমধ্যে বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যেমন দূরবর্তী শিক্ষার ব্যবস্থা এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ভিসা আবেদন।
দূতাবাসের একটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, বন্ড তালিকায় যুক্ত হওয়া একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি উন্নত হলে শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তিনি যোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে এই নীতির কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে।
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এই পরিবর্তন মানে হল, ভিসা আবেদন করার আগে আর্থিক পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের পূর্ণতা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, আবেদন প্রক্রিয়ার সময়সূচি এবং সম্ভাব্য বিলম্বের জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নীতিকে গ্লোবাল ভিসা নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ধাপ হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন, যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং মানবিক বিবেচনা একসঙ্গে সমন্বিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি কীভাবে বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অভিবাসন প্রবাহ এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফলাফলের ওপর।
এই পরিবর্তনের পর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগামী ছয় মাসের মধ্যে নীতি পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন বা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করবে। তাই, বাংলাদেশে ভিসা আবেদনকারী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই সময়সীমা মনোযোগে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।



