আইডিসিআর (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি) জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলায় থেকে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে এবং সংক্রমণের ধরন ও বিস্তার গত বছর থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই তথ্য ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক বৈজ্ঞানিক সভায় উপস্থাপিত হয়।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারিতে মোট চারজন রোগী শনাক্ত হয় এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেন, ফলে ঐ বছরে রোগের মৃত্যুহার ১০০% রেকর্ড করা হয়েছে।
এই চারটি কেসের মধ্যে নওগাঁয়ের আট বছর বয়সী শিশুর কেসটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি দেশের প্রথম ‘অ-মৌসুমি’ নিপাহ কেস হিসেবে স্বীকৃত। শিশুটি আগস্ট মাসে রোগে আক্রান্ত হয়, যা ঐতিহ্যগত শীতকালীন মৌসুমের বাইরে।
শিশুর সংক্রমণের সূত্র হিসেবে তদন্তে প্রকাশ পায়, বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত আধা-খাওয়া ফল (কালোজাম, খেজুর, আম) খাওয়া ছিল প্রধান কারণ। এই নতুন সংক্রমণ পথটি পূর্বে জানার বাইরে এবং সারা বছরই সম্ভাব্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ঐতিহ্যগতভাবে খেজুরের কাঁচা রসকে প্রধান সংক্রমণ উৎস ধরা হলেও, নওগাঁয়ের কেসটি দেখায় যে বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত যেকোনো আধা-খাওয়া ফল সরাসরি গ্রহণ করেও রোগ ছড়াতে পারে। ফলে মৌসুমী সীমাবদ্ধতা আর প্রযোজ্য নয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, নিপাহ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রায় ২৮% ক্ষেত্রে সরাসরি অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমণ ঘটেছে, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীর পরিবারকে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রাখে। মানব-থেকে-মানব সংক্রমণ এই রোগের নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
বিশ্বব্যাপী নিপাহ ভাইরাসের গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২% হলেও, বাংলাদেশে শনাক্ত চারজন রোগীর সবই মারা যাওয়ায় দেশীয় মৃত্যুহার ১০০% এ পৌঁছেছে। এই পার্থক্য স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সময়মতো সনাক্তকরণের অভাবকে নির্দেশ করে।
বিভিন্ন জেলার মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ভিন্ন, তবে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ এবং লালমনিরহাটে রোগের ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এই জেলাগুলোকে উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৭ জানুয়ারি আইডিসিআর মিলনায়তনে ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শারমিন সুলতানা উপস্থাপিত গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।
সভা পরিচালনা করেন আইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন, যিনি উল্লেখ করেন, অ-মৌসুমি কেস এবং নতুন সংক্রমণ পথ দেশের জন্য একটি গুরুতর সতর্ক সংকেত। তিনি বলেন, নিপাহ এখন শুধুমাত্র শীতকালে বা খেজুরের রসের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সারা বছরব্যাপী বহুমুখী হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
নিপাহ ভাইরাস জরিপ সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার জোর দিয়ে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি ও দ্রুত সনাক্তকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা অপরিহার্য। তিনি স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় প্রশাসন ও সম্প্রদায়কে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সময়মতো রোগ নির্ণয়, রোগীর আইসোলেশন এবং সংক্রমণ রোধে সঠিক তথ্য প্রচারই মূল চাবিকাঠি। জনগণকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ছড়িয়ে না দিয়ে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সন্দেহজনক উপসর্গে দ্রুত চিকিৎসা সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা জরুরি।



