চট্টগ্রাম বন্দরে আজ ৫৮,০০০ মেট্রিক টন ভুট্টার আনুষ্ঠানিক খালাস শুরু হয়েছে, যা আট বছর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম সরবরাহ। ভুট্টার এই চালান MV Beltokio নামের মাদার ভেসেল থেকে এসেছে, যা ৩১ ডিসেম্বর কানাডার ভ্যাঙ্কুভার বন্দর থেকে রওনা হয়ে বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের পশুখাদ্য শিল্পে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, আজকের খালাস প্রক্রিয়ায় ভুট্টা চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াপাড়া তিনটি বন্দর থেকে বিতরণ করা হবে। এই তিনটি বন্দরই দেশের প্রধান লজিস্টিক হাব, যা ভুট্টার দ্রুত গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর সুবিধা দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি প্রতিনিধি এ্যারিন কোভার্ট, যিনি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কৃষি বিষয়ক দায়িত্বে আছেন, তিনি চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করে আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। এই সাক্ষাৎকারে আমদানির পরিমাণ, গুণগত মান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
স্থানীয় নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনকারী কনফিডেন্স সিমেন্ট গাটে, যারা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা চালানকে স্বাগত জানাতে বন্দর পরিদর্শন করেন, তারা এই সরবরাহের গুরুত্বকে তুলে ধরেন। তারা উল্লেখ করেন যে, উচ্চমানের আমদানি করা ভুট্টা দেশের পশুখাদ্য শিল্পের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পুষ্টি উৎস হিসেবে কাজ করবে।
এই চালানটি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা ও মিনেসোটা রাজ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে ভুট্টা উৎপাদনের শীর্ষস্থানীয় অঞ্চলগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলগুলো বিশ্ববাজারে উচ্চমানের ভুট্টা রপ্তানির জন্য পরিচিত, যা বাংলাদেশে গুণগত মানের দিক থেকে বড় সুবিধা নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের শীর্ষ তিনটি পশুখাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—নাহার এগ্রো গ্রুপ, প্যারাগন গ্রুপ এবং নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড—এই চালানটি যৌথভাবে আমদানি করেছে। প্রত্যেকের ভাগভাগি অনুযায়ী, নারিশ ২৯,০০০ টন, প্যারাগন ১৯,০০০ টন এবং নাহার এগ্রো ১০,০০০ টন ভুট্টা সংগ্রহ করবে।
এই ভুট্টা সরাসরি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াপাড়া বন্দরে খালাস করা হবে, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পশুখাদ্য সরবরাহের লজিস্টিক চেইনকে সহজ করবে। বণ্টন প্রক্রিয়ায় রেল ও সড়ক পরিবহন ব্যবহার করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানের ভুট্টা প্রবেশের ফলে দেশীয় ভুট্টা ও আমদানি করা গমের তুলনায় দামের পার্থক্য কমে আসবে। ফলে পশুখাদ্য উৎপাদনকারীরা কাঁচামালের দামের ওঠা-নামা থেকে কিছুটা রক্ষা পাবে এবং পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারবে।
এছাড়া, এই সরবরাহের মাধ্যমে দেশের পশুপালন খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। উচ্চ প্রোটিন ও পুষ্টিকর ভুট্টা ব্যবহার করে পোল্ট্রি, গবাদি পশু ও মাছের বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত মাংস ও ডিমের বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দেবে।
দীর্ঘমেয়াদে, যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে পশুখাদ্য রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়বে। তবে, সরবরাহ শৃঙ্খলে কোনো বাধা, যেমন শুল্ক নীতি পরিবর্তন বা লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শিল্পের প্রধান খেলোয়াড়দের উচিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করে ভবিষ্যৎ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভুট্টা আমদানি চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথমবারের মতো ঘটেছে, যা দেশের পশুখাদ্য শিল্পের জন্য গুণগত মানের উন্নতি এবং বাজার স্থিতিশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই সরবরাহের সাফল্য ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরের আমদানি এবং সম্ভাব্য রপ্তানি সুযোগের পথ প্রশস্ত করতে পারে।



