মৌলভীবাজারের কামালগঞ্জ উপজেলার শ্রীনাথপুর গ্রামে শ্রীনাথপুর আলমাস উদ্দিন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গতকাল বিকালে পারভীন সুলতানা শিক্ষিকা-প্রধানের অবসর গ্রহণের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় কর্মকর্তারা একত্রে তার দশকের পর দশকের সেবা ও ত্যাগকে সম্মান জানাতে সমবেত হন।
১৯৮৭ সালে পারভীন সুলতানা নিজস্ব ৩৩ ডেসিমাল জমি দান করে বিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন। তখন গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় তিনি স্থানীয় শিশুরা যেন শিক্ষা পায়, এ উদ্দেশ্যে নিজস্ব সম্পদ উৎসর্গ করেন। তার এই উদ্যোগই শ্রীনাথপুরে প্রথম বিদ্যালয়ের সূচনা করে।
প্রাথমিক কাঠামোটি ছোট হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা সম্প্রসারিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য পারভীন সুলতানা নিজে হাতে কাজ করেন, শিক্ষার সামগ্রী সংগ্রহ করেন এবং শিক্ষক নিয়োগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ফলে গ্রামটির শিশুরা দূর শহরে না গিয়ে কাছেরই মানসম্মত শিক্ষা পেতে শুরু করে।
অবসর অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের মুখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল। অনুষ্ঠানটি সহজ একটি প্রোগ্রাম হিসেবে পরিকল্পিত হলেও শিক্ষার্থীদের গান, নৃত্য ও শ্রীনাথপুরের শিক্ষার অগ্রগতির গল্পে পূর্ণ একটি স্মরণীয় সমাবেশে রূপ নেয়।
কামালগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সোমা ভট্টাচার্য্য প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি পারভীন সুলতানাকে আদর্শ শিক্ষকের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “একজন শিক্ষক যেন তার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিজের সব কিছু দিতে প্রস্তুত থাকে।” তার কথায় উপস্থিত সকলের সম্মতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অবসর গ্রহণের মুহূর্তে পারভীন সুলতানা চোখে অশ্রু নিয়ে বলেন, “এই বিদ্যালয়টি শুধু একটি ইটের গঠন নয়; এটি আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা, আমার আত্মা।” তিনি নিজের ত্যাগকে কখনো অনুভব করেননি, কারণ শিক্ষার্থীর হাসি ও অভিভাবকের কৃতজ্ঞতা তার সর্বোচ্চ পুরস্কার।
তার জীবনের দীর্ঘ পথচলা নানা চ্যালেঞ্জে ভরা ছিল। বিদ্যালয়ের প্রথম দিনগুলোতে মৌলিক অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষক সংকট এবং আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবু পারভীন সুলতানা দৃঢ়সংকল্পে এগিয়ে গিয়ে বিদ্যালয়কে স্থিতিশীল করে তোলেন।
২০১৬ সালে বিদ্যালয় সরকারী স্বীকৃতি পায় এবং জাতীয়করণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই পরিবর্তন শিক্ষার মানোন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, ফলে গ্রামটির শিশুরা সরকারী পাঠ্যক্রমের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
অবসর গ্রহণের পর পারভীন সুলতানা জানান, “আমি কখনো ত্যাগের অনুভূতি পেয়েছি না, কারণ শিক্ষার্থীর ভালবাসা, অভিভাবকের সমর্থন এবং সহকর্মীদের সহযোগিতা আমার সর্বোচ্চ পুরস্কার।” তিনি বিদ্যালয়কে নিজের সন্তান হিসেবে দেখেন এবং এখনো তার প্রতি গভীর আবেগ বজায় আছে।
অধিকর্তা প্রধান শিক্ষক হোসনোরা বেগম পারভীন সুলতানার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐক্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, “একজন শিক্ষকের দৃঢ়তা ও ন্যায়বোধই শিক্ষার পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে।” তিনি নতুন দায়িত্বে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
শ্রীনাথপুরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য স্থানীয় সমাজে শিক্ষা সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে। পারভীন সুলতানার ত্যাগ ও নিষ্ঠা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করবে।
আপনার গ্রামে যদি এমন কোনো শিক্ষকের ত্যাগের গল্প থাকে, তা শেয়ার করুন এবং স্থানীয় শিক্ষার উন্নয়নে কীভাবে অবদান রাখতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা করুন।



