বাংলাদেশের মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের নতুন দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা চলছে। interim সরকার, যার নেতৃত্বে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনুস আছেন, ২০২৫ সালের মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অর্ডিনেন্সের খসড়া প্রকাশ করেছে। এই নীতিমালা দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ককে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা থেকে বাদ রাখার সমস্যার সমাধান লক্ষ্য করে।
অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (FID) নতুন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান – মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক – প্রস্তাব করেছে। এই ব্যাংকগুলো মাইক্রোক্রেডিট সংস্থার গ্রাহক পৌঁছানোর ক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের সেবা সমন্বয় করবে, যেমন সঞ্চয়ী হিসাব, কৃষি সহায়তা এবং অন্যান্য আর্থিক পণ্য, যেগুলোর জন্য জামানত প্রয়োজন হবে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হুসেইন এই প্রস্তাবকে “প্রগতিশীল পদক্ষেপ” বলে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি এই ব্যাংকগুলো সামাজিক-ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করে, তবে কোনো বাধা দেখা যাবে না।
প্রস্তাবিত মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকগুলো শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ গ্রহণ এবং লভ্যাংশ বিতরণ করতে পারবে, ফলে মুনাফা অর্জনের প্রণোদনা যুক্ত হবে। এটি ঐতিহ্যবাহী মাইক্রোফাইন্যান্স মডেলের মূল নীতি—লাভ পুনঃবিনিয়োগ ও সামাজিক সেবা—এর সঙ্গে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করবে।
এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহৎ মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। ব্র্যাক এবং এএসএসহ প্রধান সংস্থাগুলো রবিবার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছে, নতুন খসড়া মাইক্রোফাইন্যান্সের বাস্তবতা উপেক্ষা করেছে। তারা বিশেষ করে “অধিকাংশ” এবং “লাভ” এর পার্থক্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো দাতব্য সংস্থা নয়; তারা পরিচালন ব্যয় ও অতিরিক্ত আয় মেটাতে সুদ ধার করে। বর্তমান এনজিও-ভিত্তিক কাঠামোতে এই অতিরিক্ত আয়কে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ভাগ করা যায় না; তা পুনঃবিনিয়োগ বা মূলধন শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার করতে হয়।
নতুন অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়ে মুনাফা বিতরণ সম্ভব হবে, যা ঐতিহ্যবাহী মডেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সমর্থকরা দাবি করেন, এই ব্যবস্থা আর্থিক স্থায়িত্ব বাড়াবে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।
বিপক্ষের যুক্তি হল, মুনাফা ভাগাভাগি করলে আর্থিক সংস্থার সামাজিক মিশন দুর্বল হতে পারে। তারা সতর্ক করে, অতিরিক্ত মুনাফা অনুসরণে গ্রাহকদের ওপর সুদের হার বাড়তে পারে এবং মূল লক্ষ্য—দারিদ্র্যমুক্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—হ্রাস পেতে পারে।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার এবং লভ্যাংশের হার নির্ধারণের জন্য স্পষ্ট নিয়মাবলী এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এই অনিশ্চয়তা মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ তারা তাদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে চায়।
মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকগুলো যদি সফল হয়, তবে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সঞ্চয়ী হিসাব ও কৃষি ঋণ সহজলভ্য হবে, যা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে, নতুন মডেলটি আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে। শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার, লভ্যাংশের বিতরণ এবং মুনাফা ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট নীতি গঠন করা হবে কিনা, তা ভবিষ্যতে খাতের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অর্ডিনেন্সের খসড়া মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে চায়, তবে এটি সামাজিক মিশন ও লাভজনকতার মধ্যে সমতা রক্ষার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতবিরোধ এবং নিয়ন্ত্রক দিকের স্পষ্টতা শেষ পর্যন্ত এই নীতির বাস্তবায়ন ও প্রভাব নির্ধারণ করবে।



