ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক গত পনেরো বছরে ঘনিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করে তীব্র টানাপোড়েনে পরিণত হয়েছে। এই অবনতি আইপিএল ২০২৬ নিলামে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া, ভারতীয় মিডিয়ার ধারাবাহিক বিরোধী প্রচার এবং শারিফ ওসমান হাদির হত্যার পর তার সন্দেহভাজনদের ভারতে পলায়নসহ একাধিক ঘটনার ফলে তীব্রতর হয়েছে।
ইতিহাসে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনো সম্পূর্ণ সুমধুর ছিল না; বিভিন্ন সরকারে সীমান্ত বিরোধ, জলসম্পদ ও বাণিজ্যিক সমস্যার কারণে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তবে গত দশকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়লেও, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ঐ ঐতিহাসিক উত্তেজনাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
২০২৬ সালের আইপিএল নিলামে মুস্তাফিজুর রহমানের নাম তালিকায় না থাকায় বাংলাদেশি ভক্ত ও ক্রীড়া কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে। যদিও নিলামটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবে বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া দুই দেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে প্রভাব ফেলেছে।
একই সময়ে, ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে তথ্য যাচাই ছাড়া অপপ্রচার চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ চ্যানেল ও পত্রিকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে, যা দু’দেশের জনমতকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে।
ডিসেম্বরে শারিফ ওসমান হাদির, যিনি ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম মুখপাত্র, তার হত্যাকারী কয়েকজনকে ভারতীয় সীমান্ত পার করে পলায়ন করার খবর বেশ কয়েকটি মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। হাদিরের হত্যার পর সন্দেহভাজনরা ভারতের আশ্রয় নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়, যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশিত হয়নি।
বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল হাদিরের হত্যাকারীদের ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা ভারতীয় দূতাবাসের ঘেরাও ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে, এবং ‘জুলাই ঐক্য’ নামে একটি সংগঠন ঢাকায় ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ নামে প্রতিবাদ রেলি সংগঠিত করার আহ্বান জানায়।
প্রতিবাদকারীরা দূতাবাসের সামনে সমাবেশের পরিকল্পনা করলেও, ঢাকা শহরের উত্তর বাড্ডাতে পুলিশ ব্যারিকেড স্থাপন করে রেলিটিকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়। নিরাপত্তা বজায় রাখতে গৃহস্থালীর গুলির ব্যবহার না করে, পুলিশ গুলিবর্ষণ না করে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদকারীদের আটক করে।
বছরের পর বছর পর, ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম পরিবর্তন করে ‘ফেলানী এভিনিউ’ রাখা হয়েছে। এই নামকরণটি প্রায় পনেরো বছর আগে বিএসএফের হাতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের স্মরণে করা হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এই অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশি জনগণ সীমান্তে হিংসা বন্ধের আহ্বান জানায় এবং ফেলানীর স্মৃতি রক্ষার জন্য এই সড়কের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
এদিকে, এনসিপি দলের শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ শারিফ ওসমান হাদিরের হত্যার পর তার সন্দেহভাজনদের ভারতীয় আশ্রয় নিয়ে মন্তব্য করেন যে, যদি ভারত বাংলাদেশের শত্রুদের তাদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দেয়, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হবে। তার এই বক্তব্য উভয় দেশের কূটনৈতিক সংলাপে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, এই ধারাবাহিক ঘটনার ফলে দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপের গতি ধীর হতে পারে, বাণিজ্যিক চুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে এবং ভবিষ্যতে সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। উভয় পক্ষের সরকার যদি দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো সমাধান না করে, তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্তরে আরও তীব্রতা দেখা দিতে পারে।



