সুদানের উত্তর কোর্দোফানের এল‑ওবেইদ শহরে এক বাসভবনে ড্রোন হামলা ঘটেছে, যার ফলে কমপক্ষে তেরজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে আটজন শিশু। এই হামলা ঘটেছে যখন শহরের বেশিরভাগ এলাকা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, এবং স্থানীয় চিকিৎসক নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী পরিবারিক সদস্যদের অধিকাংশই একই গৃহে বসবাস করছিল।
হামলার পরপর জানা যায়, মৃতদের বেশিরভাগই একক পরিবারের সদস্য, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোকের কারণ হয়েছে। মৃতদের বয়সের পরিসীমা শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং শিশুরা বিশেষভাবে দুর্বল অবস্থায় ছিলেন।
দায়িত্বের দায়িত্ব স্বীকার করা কোনো গোষ্ঠী না থাকলেও, চিকিৎসক নেটওয়ার্কের বিশ্লেষণে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) এই আক্রমণের পেছনে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। RSF পূর্বে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে আসছে, এবং এই হামলা তাদের কৌশলগত লক্ষ্যকে নির্দেশ করে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে RSF-র গৃহযুদ্ধ তৃতীয় বর্ষে প্রবেশের কাছাকাছি, যা জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিন বছর ধরে চলমান এই সংঘাতের ফলে ১১ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে, আর শত শত হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
সংঘাতের ফলে সৃষ্ট মানবিক দুরবস্থার মধ্যে ব্যাপক যৌন হিংসা অন্যতম, যা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ধরনের অপরাধকে নিন্দা করে এবং উভয় পক্ষকে দায়ী করে তুলেছে। RSF এবং সুদানি সশস্ত্র বাহিনী উভয়ই যুদ্ধকালীন অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখি।
স্থানীয় সাক্ষীরা জানান, ড্রোন হামলা একটি বাসগৃহের সামনে ঘটেছে, যা সম্পূর্ণভাবে বসতিবাসী এলাকার অংশ। ঘরটি শান্তিপূর্ণ পাড়া হিসেবে পরিচিত ছিল, এবং হঠাৎ আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা পুরো গৃহকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক এই ঘটনার ওপর মন্তব্য করে বলেছেন, এটি নিরাপদ বাসস্থানকে লক্ষ্য করে করা এক ধরনের অনিয়মিত হত্যাকাণ্ড এবং পরিকল্পিত বোমাবর্ষণের নতুন মাত্রা প্রকাশ করে। নেটওয়ার্কের মতে, এমন আক্রমণ গৃহযুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলছে এবং নাগরিকদের সুরক্ষাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এল‑ওবেইদ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রাজধানী খার্তুম এবং দারফুর অঞ্চলের মধ্যে সংযোগস্থল। RSF এই শহরকে তাদের সমান্তরাল সরকার গড়ে তোলার এবং জেনোসাইডের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তাই এই আক্রমণকে কেবল একক ঘটনার বদলে বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই হামলার কয়েক দিন আগে, একই গোষ্ঠীকে আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আক্রমণ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, যা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তদুপরি, সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, RSF উত্তর মেরোয়েতে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধের ওপর ড্রোন আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল, যা অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই RSF-কে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে, এবং সুদানের শান্তি প্রক্রিয়ার পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নও সংঘাতের সমাধানে মধ্যস্থতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবে উভয় পক্ষের অবিচ্ছিন্ন আক্রমণ পরিকল্পনা মধ্যস্থতার পথকে কঠিন করে তুলছে।
বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ পর্যায়ে উল্লেখ করেন, যদি এল‑ওবেইদের নিয়ন্ত্রণের লড়াই অব্যাহত থাকে, তবে RSF-র অগ্রগতি উত্তর কোর্দোফানে আরও বিস্তৃত হতে পারে, যা মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়লে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার দরজা খুলতে পারে, তবে তা বাস্তবায়নের জন্য নিরাপদ মানবিক সহায়তা প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি সতর্কতা, যেখানে গৃহযুদ্ধের তীব্রতা এবং নাগরিকদের উপর সরাসরি আক্রমণ বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংরক্ষণে নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।



