ইলিশের গন্ধে ভরা ঢাকা শহরে ৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন বিদেশি পর্যবেক্ষকদের খাবার-খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি ও বৈষম্যমূলক বলে নিন্দা করে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এই ধরনের আর্থিক সহায়তা বিপরীত ফল দিতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের খরচ বহন করা হয়, তবে দেশীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য একই সুবিধা কেন না দেওয়া হবে, এ প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান টিআইবির দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে ‘অবিমৃশ্যকারী’ বলে বর্ণনা করেন এবং এটিকে স্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা তাদেরকে ‘ভাড়াটে’ হিসেবে গণ্য করার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা স্বাধীনভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া মূল্যায়নের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কমিশনের আতিথেয়তা গ্রহণের ফলে পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহের স্রোত তৈরি হবে, এটাই টিআইবির মূল উদ্বেগ। ড. ইফতেখারুজ্জামান বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নৈতিক মানদণ্ড রক্ষার জন্য ইসির আতিথেয়তা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো পর্যবেক্ষক সরকারী তহবিল বা ইসির আর্থিক সহায়তায় কাজ করলে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উত্থাপিত হবে।
টিআইবি অতীতের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ২০০৮ সালের পূর্বে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ের প্রয়োজন ছিল না। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সরকার বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সুবিধা দিলেও তা নির্বাচনকে অধিক গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেনি। এই অভিজ্ঞতা থেকে টিআইবি ইসির বর্তমান সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে দেখছে।
জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের চাহিদা বাড়ে। টিআইবি এই প্রেক্ষাপটে ইসিকে আহ্বান জানায়, যেন অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দিয়ে নির্বাচনকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু না করে, বরং স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখে।
টিআইবির বিবৃতি অনুযায়ী, যদি কমিশন বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা চালু রাখে, তবে দেশীয় পর্যবেক্ষকদের সমান সুযোগ না দেওয়া হলে বৈষম্যের অভিযোগ তীব্র হবে। এ ধরনের নীতি নির্বাচনের বৈধতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসির এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে টিআইবি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আর্থিক সহায়তা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
টিআইবির দৃষ্টিতে, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ায় এবং নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই, কমিশনকে এই নীতি পুনরায় মূল্যায়ন করে সমান সুযোগের নীতি অনুসরণ করা উচিত।
এই বিতর্কের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যদিও কোনো দল সরাসরি মন্তব্য করেনি, তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার জন্য সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
টিআইবির মন্তব্যের পর ইসির পক্ষ থেকে কোনো তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ভবিষ্যতে কমিশনের সিদ্ধান্তে সংশোধন আনা হলে, তা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, টিআইবি ইসির বিদেশি পর্যবেক্ষকদের খরচ বহনের সিদ্ধান্তকে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি, বৈষম্য এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাসের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে। তিনি কমিশনকে নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করে, আর্থিক সহায়তা ছাড়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বজায় রাখতে আহ্বান জানান।



