মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী শনি-রাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে, সঙ্গে বিমান হামলা ও নৌবাহিনীর সমর্থন প্রদান করে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি গেনিভা শহরে সাংবাদিকদের সামনে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ডীয় অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর হুমকি বা বলপ্রয়োগ করা আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী।
শামদাসানি এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে সাড়া দিতে আহ্বান জানান, যাতে স্পষ্ট হয় যে এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি যুক্তি দেন, মানবাধিকারকে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক হস্তক্ষেপ করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।
মাদুরো শনি-রাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সোমবার নিউইয়র্কের আদালতে উপস্থিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা আনা মাদক পাচার ও অন্যান্য অভিযোগের প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দাবি করেন যে তিনি অপহৃত হয়েছেন এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দায়িত্ব অব্যাহত রয়েছে। মাদুরো ২০১৩ সালে হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর দেশের শীর্ষে অধিষ্ঠিত হন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাদুরোর শাসনকে নির্বাচনী জালিয়াতি, বিরোধী দলের দমন এবং ব্যাপক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করে সমালোচনা করে। তারা উল্লেখ করে, সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরো ক্ষমতা বজায় রাখতে ভোটের ফলাফলকে বিকৃত করেছে। শামদাসানি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে মানবাধিকার রক্ষার দাবি থাকা সত্ত্বেও, একতরফা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কোনো দায়িত্বশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলায় মানবাধিকার অবনতি ও রাজনৈতিক সংকটের ওপর রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে। শামদাসানি উল্লেখ করেন, শনি-রাতে ভেনেজুয়েলীয় কর্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সম্পত্তি জব্দ, চলাচল সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবাদ অধিকার স্থগিতের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের জরুরি অবস্থা মানবাধিকার রক্ষার জন্য কোনো বিজয় নয়, বরং সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকায় সামরিক হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে কিউবায় ১৯৬১ সালের বেইল অফ পিগস এবং ১৯৮০-এর দশকে নিকারাগুয়ায় কন্ট্রা যুদ্ধ উল্লেখ করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাবের সমালোচনা করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা এই ঐতিহাসিক উদাহরণগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে।
মাদুরোর গ্রেপ্তার ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপগুলো এখনও অনিশ্চিত। ভেনেজুয়েলীয় সরকার জরুরি অবস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায়ও মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযুক্ত অভিযোগের ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলছে।
আঞ্চলিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলোও এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ক্যারিবিয়ান কমিউনিটি এবং লাতিন আমেরিকান স্টেটস অর্গানাইজেশন (সিএলএস) ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানিয়ে, আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডের প্রতি সম্মান বজায় রাখার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সংক্ষেপে, শনি-রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ ও মাদুরোর গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের মুখপাত্রের মন্তব্য এই বিষয়কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে তুলে ধরেছে এবং একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সমন্বিত সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কীভাবে পুনর্গঠন হবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।



