২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানের মুদ্রা হঠাৎ করে ডলারের তুলনায় তীব্রভাবে অবমূল্যায়িত হওয়ার পর রাজধানী তেহরানে জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়ে। এর পরপরই দেশব্যাপী প্রতিবাদ শুরু হয়, যার ফলে ৩১ প্রদেশের মধ্যে অন্তত ১৭টি প্রদেশে সরকারবিরোধী র্যালি দেখা যায়। এই আন্দোলন ২০২২ সালের নারী-স্বাধীনতা প্রতিবাদের পর সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিবাদগুলোকে নথিভুক্ত করতে ভিডিও রেকর্ডিং ব্যবহার করা হয়েছে, এবং এই রেকর্ডিংগুলো থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে প্রকৃত প্রদেশের সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি। বর্তমানে ১০ দিনের মধ্যে ১০০টিরও বেশি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে, যেগুলো ভৌগোলিকভাবে চিহ্নিত এবং প্রকাশের তারিখ নির্ধারিত। এই তথ্যের ভিত্তিতে অন্তত ৫০টি শহর ও গ্রামকে প্রতিবাদে যুক্ত দেখা গেছে।
প্রতিবাদের সূচনা মূলত মুদ্রা অবমূল্যায়নের ফলে জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতি জনগণের ক্রোধের ফল। তেহরানে শুরু হওয়া র্যালি দ্রুতই দেশের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পূর্বে সরকারকে সমর্থনকারী হিসেবে বিবেচিত অঞ্চলগুলোতেও প্রতিবাদের দৃশ্য দেখা যায়।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় শহর কুম এবং উত্তর-পূর্বের মাশহাদে প্রতিবাদ গৃহীত হয়েছে, যদিও এই দুই শহর ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেখিয়েছে। এই শহরগুলোতে জনসমাগমের দৃশ্য ভিডিওতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে, যা সরকারের সমর্থনভিত্তি দুর্বল হচ্ছে এমন ইঙ্গিত দেয়।
গবেষক সিনা আজোদি, গেজ় গেজ় ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক, উল্লেখ করেছেন যে কুম ও মাশহাদের মতো ঐতিহ্যবাহী সমর্থনশীল শহরে প্রতিবাদ দেখা দেওয়া দেশের অর্থনৈতিক কষ্টের ফলে শাসনের ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে তা প্রমাণ করে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধরনের বিস্তৃত আন্দোলন সরকারকে আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে কঠিন অবস্থায় ফেলতে পারে।
২০২২ সালে মহসা আমিনি নামের এক তরুণীকে হিজাবের ভুল পরিধানের জন্য গ্রেফতার করে কারাগারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সৃষ্ট নারী-স্বাধীনতা প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা ৫৫০েরও বেশি মানুষ নিহত হয় বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো রিপোর্ট করেছে। সেই সময়ের তুলনায় বর্তমান প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার পূর্বে সহিংস পদ্ধতিতে প্রতিবাদ দমন করেছে। ২০২২ সালের প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার করা হিংসা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়নি, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু শহরে গুলিবিদ্ধ এবং গ্রেপ্তারীর খবর শোনা যাচ্ছে।
প্রতিবাদগুলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অসন্তোষ নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি বিস্তৃত অবিশ্বাসের প্রতিফলন। তেহরানের কেন্দ্রীয় এলাকায় এবং অন্যান্য প্রধান শহরে জনসমাগমের দৃশ্য দেখায় যে জনগণ সরকারী নীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে এই বিস্তৃত প্রতিবাদ শাসনের স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। সরকার যদি অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান না করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ব্যবহার চালিয়ে যায়, তবে প্রতিবাদ আরও তীব্র হতে পারে।
অবশেষে, ইরানের সরকারকে এখন আর্থিক নীতি পুনর্বিবেচনা, মুদ্রা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং জনমতকে শোনার প্রয়োজন। না হলে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরদারিও তীব্র হবে।



