১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা মুক্তিযুদ্ধের সময়, পশ্চিম পাকিস্তোর দখলে থাকা ঢাকায় সাধারণ মানুষের জীবন কিভাবে বদলে গিয়েছিল, তা তিনটি স্বতন্ত্র ডায়েরি থেকে জানা যায়। জাহানারা ইমাম, এক বুদ্ধিজীবী এবং একজন কবি-সাংস্কৃতিক আইকন তাদের ব্যক্তিগত নোটে যুদ্ধের ভয়, কুফল, হঠাৎ হামলা এবং স্বাধীনতার আশার মুহূর্তগুলো রেকর্ড করেছেন।
ডায়েরিগুলো “একাত্তরের দিনগুলি”, “আবরুদ্ধা ঢাকা” এবং “একাত্তরের ডায়েরি” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। জাহানারা ইমাম (১৯২৯‑১৯৯৪), যাকে শহীদ জননী বলা হয়, তার ডায়েরি ১ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত দৈনন্দিন ঘটনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। এতে কুফল, রেডিওতে ঘোষিত সামরিক আদেশ, রাস্তায় হঠাৎ বোমা ফাটানো এবং নাগরিকদের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
বুদ্ধিজীবী দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত “আবরুদ্ধা ঢাকা” শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ব্যাহত হওয়া এবং শিল্পকর্মের সৃষ্টিতে বাধা সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেয়। একই সময়ে, কবি-সাংস্কৃতিক আইকন তার ডায়েরিতে কবিতার মাধ্যমে মানুষের মানসিক অবস্থা, আত্মত্যাগের গল্প এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে শব্দে গড়ে তোলেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ১৯৭১ সালের সংঘাতকে শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পশ্চিম পাকিস্তোর সঙ্গে কূটনৈতিক সমর্থন বজায় রাখলেও, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান করে। এই দ্বিমুখী সমর্থন যুদ্ধের সময়কালে কূটনৈতিক নীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন ঘটায়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ডায়েরিগুলো যুদ্ধের সামরিক দিকের চেয়ে মানবিক দিককে বেশি গুরুত্ব দেয়। “যুদ্ধের গৌরবময় বিজয় গৌণ, তবে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামই ইতিহাসের মূল স্তম্ভ”—এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গবেষকরা করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ডায়েরিগুলো কেবল ঐতিহাসিক নথি নয়, বরং মানবিক সহনশীলতার সাক্ষ্য।
ডায়েরিগুলোর মাধ্যমে জানা যায়, কুফল সময়ে রাস্তায় গাড়ি চলাচল সীমিত ছিল, বাজারে খাবারের ঘাটতি দেখা দিত এবং রাতের বেলা অচেনা গুলিবিদ্ধ শব্দ শোনা যেত। তবুও, মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শিশুর জন্ম, এবং পারিবারিক মিলনমেলায় অংশ নিতে চেষ্টা করত, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বজায় রাখার একটি উপায় ছিল।
ঢাকায় রেডিওতে প্রকাশিত ঘোষণাগুলো প্রায়ই নাগরিকদের আতঙ্ক বাড়াত। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের রাতে হঠাৎ বোমা ফাটিয়ে রেডিও স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তথ্যের অভাব বাড়ে। ডায়েরি লেখকরা এই ঘটনার পরপরই আশেপাশের বাড়ি থেকে শোনা যায় গুঞ্জন, যা সমাজের অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
ডায়েরিগুলোতে উল্লেখিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারীর ভূমিকা। জাহানারা ইমাম তার ডায়েরিতে নারী স্বেচ্ছাসেবকদের খাবার বিতরণ, আহতদের যত্ন এবং গোপন তথ্য সংগ্রহে অংশগ্রহণের কথা লিখেছেন। এই কাজগুলো যুদ্ধের সময় নারীর সামাজিক অবস্থানকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল।
বুদ্ধিজীবী ডায়েরিতে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার পরও কিছু শিক্ষক গোপনে পাঠ চালিয়ে যান। তারা ছাত্রদের স্বাধীনতার আদর্শ এবং ইতিহাসের সত্যতা শেখাতে চেষ্টা করেন। এই গোপন শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জাতীয় চেতনা গড়ে ওঠে।
কবির ডায়েরিতে কবিতার মাধ্যমে যুদ্ধের বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “যুদ্ধের ছায়া গাছের ডালে, কিন্তু হৃদয়ের পাতা কখনো মরে না”—এটি মানুষের আত্মার অটুটতা প্রকাশ করে। এই রচনাগুলো পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। ভারত-বাংলাদেশের সীমানা পুনর্গঠন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং শীতল যুদ্ধের ত্রিপক্ষীয় সমতা এই সংঘাতের পরিণতি। ডায়েরিগুলো এই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাইক্রো স্তরে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল তা প্রকাশ করে।
ডায়েরিগুলোর প্রকাশের পর থেকে, গবেষক ও ইতিহাসবিদরা এই নথিগুলোকে বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে যুদ্ধের সময় নাগরিক সমাজের স্ব-সংগঠন এবং আত্মনির্ভরতা স্বাধীনতার অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনেও প্রতিফলিত হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, “একাত্তরের দিনগুলি”, “আবরুদ্ধা ঢাকা” এবং “একাত্তরের ডায়েরি” কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, বরং যুদ্ধের সময় মানবিক অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ সংগ্রহ। এই ডায়েরিগুলো আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মানবিক সহনশীলতার সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।



