কুইবেকের মন্ট্রিয়াল থেকে দুই ঘণ্টা উত্তরে অবস্থিত একটি পার্কে মানব অংশগ্রহণকারীদের মাধ্যমে শিকার‑শিকারের গতিবিদ্যা অনুকরণ করা একটি গেম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই গেমটি ক্যানাডার কুইবেক প্রদেশে গবেষক দল দ্বারা পরিচালিত, যেখানে শিকার, মাঝারি শিকারী এবং শীর্ষ শিকারীর ভূমিকা মানব খেলোয়াড়দের ওপর আরোপ করা হয়। গেমের লক্ষ্য ছিল প্রকৃত পরিবেশে প্রাণীর আচরণকে নকল করে ডেটা সংগ্রহ করা এবং ইকোলজি বিশ্লেষণের নতুন পদ্ধতি পরীক্ষা করা।
গেমটি “ট্রফিক ইন্টারঅ্যাকশনস এক্সপেরিমেন্ট” (TrophIE) নামে পরিচিত, যা ২০২৩ সালে একটি গ্রীষ্মকালীন স্কুল প্রকল্পের অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল বড় ডেটা সেট বিশ্লেষণের উন্নত কৌশল শেখানো, পাশাপাশি গাণিতিক মডেল ও মাঠ গবেষণার মধ্যে সেতু গড়ে তোলা। গবেষক দল এই গেমকে একটি মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে ব্যবহার করে, যেখানে বাস্তব ল্যান্ডস্কেপে মানব খেলোয়াড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন প্যারামিটার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
গেমের সেশনগুলো মোট নয়টি, প্রত্যেকটি প্রায় ত্রিশ মিনিটের, এবং প্রতিটি সেশনে ২৩ থেকে ৩১ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। অংশগ্রহণকারীরা শিকার (prey), মাঝারি শিকারী (mesopredator) এবং শীর্ষ শিকারী (apex predator) হিসেবে রঙিন শার্ট পরিধান করে নিজেদের ভূমিকা চিহ্নিত করতেন। শিকারী দলকে খাবার ও সঙ্গী খুঁজে বের করা এবং শিকারের হাত থেকে বাঁচা ছিল প্রধান লক্ষ্য, যেখানে মাঝারি শিকারীদের কাজ ছিল ছোট প্রাণী শিকারের পাশাপাশি শীর্ষ শিকারীর কাছ থেকে বাঁচা। শীর্ষ শিকারীরা উভয় গ্রুপকে শিকারের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন।
গেমে অংশ নেওয়া লাভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজি বিশেষজ্ঞ ডেভিড বোলডুক উল্লেখ করেন, “এটি খুবই মজার অভিজ্ঞতা” এবং মানবিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রতিফলিত করে তা দেখার সুযোগ পেয়ে তিনি সন্তুষ্ট। একই সময়ে লাভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি গবেষক ফ্রেডেরিক ডুলুদে-দে ব্রোয়িন গেমের বৈজ্ঞানিক মূল্য তুলে ধরেন, “এটি গাণিতিক মডেল এবং প্রকৃত ক্ষেত্র গবেষণার মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ স্থাপন করে, যেখানে আমরা বাস্তবিক পরিবেশে সব প্যারামিটার নিয়ন্ত্রণ করে ফলাফল মাপতে পারি”।
গেমের সময় শিকারী দলগুলোকে নির্দিষ্ট রঙের শার্ট পরিধান করতে হয়; শিকারীরা সাধারণত হালকা রঙের শার্ট, মাঝারি শিকারীরা মাঝারি রঙের শার্ট এবং শীর্ষ শিকারীরা উজ্জ্বল লাল শার্ট পরতেন। এই রঙের পার্থক্য দলগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য তৈরি করে, যা শিকারের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। গেমের নিয়ম অনুসারে, শিকারীরা খাবার সংগ্রহের পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিতে বাধ্য, আর শিকারের সময় শিকারের তীব্রতা ও দিক নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট স্কোরশিট ব্যবহার করা হয়।
গবেষকরা গেমের ফলাফল “মেথডস ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন” জার্নালে ১৭ নভেম্বর প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উপস্থাপন করেছেন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে মানব অংশগ্রহণকারীরা নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে প্রাণীর মতোই সিদ্ধান্ত নেয়, যা ইকোলজি ডেটা বিশ্লেষণে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করে। গেমের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য শিকারের গতিবিদ্যা, শিকারের চাপ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সম্ভব করেছে।
এই ধরনের সিমুলেশন গেম বিজ্ঞানী ও শিক্ষার্থীদের জন্য ইকোলজি তত্ত্বকে বাস্তবিকভাবে বুঝতে সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া, মানবিক আচরণকে প্রাণীর আচরণের সাথে তুলনা করে দেখা যায় যে পরিবেশগত চাপের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্যাটার্নে সাদৃশ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বৃহত্তর স্কেলে ইকোসিস্টেমের জটিলতা বিশ্লেষণ করা এবং সংরক্ষণ নীতি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে।
গেমের সফলতা এবং গবেষণার ফলাফল বিবেচনা করে, বিজ্ঞান সম্প্রদায়কে এই ধরনের ইন্টারেক্টিভ পদ্ধতি আরও বিকাশের জন্য উৎসাহিত করা উচিত। আপনি কি মনে করেন, মানবিক সিমুলেশন গেমের মাধ্যমে ইকোলজি শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব, নাকি বাস্তব ক্ষেত্র গবেষণাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



