ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা দ্বৈত নাগরিকত্বের নথি না থাকা বা অস্পষ্টতা দেখিয়ে ৩০০টি আসনে মোট ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাতিলকৃত প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি (জাপা), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অন্তর্ভুক্ত।
বিএনপির ২৫ জন, জামায়াতে ইসলামের ১০ জন, এনসিপির ৩ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯ জন, জাতীয় পার্টির ৫৯ জন, সিপিবির ২৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা ৩৩৮ জন। বাকি প্রার্থীরা অন্যান্য দল থেকে। দ্বৈত নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কতজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো নির্বাচন পরিচালনা অধিশাখা থেকে পাওয়া যায়নি; তারা এখনও সম্পূর্ণ তালিকা সংগ্রহ করতে অক্ষম।
সিলেট, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম ও শেরপুরে জামায়াতে ইসলামের চারজন, এনসিপির একজন এবং বিএনপির চারজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের তথ্য ইসির কাছে পৌঁছেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা মুখ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদিও একই ধরনের নথি জমা দেওয়া অন্যান্য প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ফলাফল দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারোয়ার এই পরিস্থিতি নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে বলেন, “বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে বিভিন্ন জেলায় আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এভাবে চলতে থাকলে আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না, তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে।”
অন্যদিকে, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একপাক্ষিক আচরণকে সমালোচনা করে বলেন, “যদি বিএনপি গণতন্ত্র রক্ষা করতে চায়, তবে প্রশাসনের নগ্ন আচরণের বিরুদ্ধে তাদেরও সাড়া দিতে হবে।” তিনি এই মন্তব্য শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত শেষে, ‘আজাদির যাত্রা’ সময় সাংবাদিকদের সামনে প্রকাশ করেন।
হবিগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াতের প্রার্থী ওলিউল্লাহ নোমান ফেসবুকে পোস্ট করে ইসির দ্বৈত নাগরিকত্ব নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মাহবুব সালেহীর মনোনয়ন বাতিলের পেছনে ইসির অজ্ঞতা এবং ফ্যাসিবাদী মনোভাব রয়েছে। নোমান আরও বলেন, “মাহবুব সালেহী ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের পদ্ধতি অনুসরণ করে, তবু তার আবেদন বাতিল করা হয়েছে।” এই পোস্টে তিনি প্রশাসনের রন্ধ্রপূর্ণ আচরণকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন।
ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দ্বৈত নাগরিকত্বের নথি সংগ্রহের প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি এবং ভবিষ্যতে আরও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। প্রার্থীদের বাতিলকরণে সমান মানদণ্ড প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে পারে। বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকত্বের নথি যাচাইয়ের পদ্ধতি ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হতে পারে।
পরবর্তী ধাপে ইসির সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা, প্রার্থীদের আপিল প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহের দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থীদের পক্ষে আপিল দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নির্বাচনী পর্যায়ে ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে।
এই ঘটনাগুলি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে প্রতিটি দল তাদের প্রার্থীদের সমর্থন বজায় রাখতে এবং নির্বাচনী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। ইসির দ্বৈত নাগরিকত্ব নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে।



