জেনেভা, ৬ জানুয়ারি – যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে গ্রেফতার করার পর, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক উচ্চ কমিশনার এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি, বিশেষ করে আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান না করার অভিযোগে সমালোচনা করেছেন।
কমিশনের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি জেনেভায় সাংবাদিকদের সামনে বললেন, কোনো রাষ্ট্রের সীমানা বা স্বশাসনের অধিকারকে হুমকি দেওয়া বা জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার বিরোধী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই কাজকে “আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতির অবজ্ঞা” হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই মন্তব্যের পরই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কয়েকটি মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিরোধিতা প্রকাশ করে। বৈঠকে সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণকারী দেশ ছিল ফ্রান্স, যার স্থায়ী উপ-প্রতিনিধি জয় ধর্মাধিকারী যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাদুরোর গ্রেফতারকে শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি নীতি ও বলপ্রয়োগ না করার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেন।
ফ্রান্সের এই মন্তব্যের সঙ্গে চীনের ধারাবাহিক বিরোধিতাও প্রকাশ পায়। চীনের প্রতিনিধি চতুর্থ ধারাবাহিক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে “বেপরোয়া” এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার প্রতি অবহেলা হিসেবে উল্লেখ করে, এবং ভেনেজুয়েলায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার আহ্বান জানায়।
ইতিপূর্বে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং মাদুরো পরিবারকে গ্রেফতার করার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে। তারা উল্লেখ করেছে যে এই ধরনের হস্তক্ষেপ ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অনুমোদিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই অভিযানের পেছনে মূলত মাদুরোর সরকারকে অবৈধ ড্রাগ ট্রেডের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ তুলে, তার নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার দাবি করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুক্তি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগের কাছ থেকে স্বীকৃতি পায়নি, কারণ এটি ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে সরাসরি লঙ্ঘন করে।
ভেনেজুয়েলার সরকারও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মাদুরো সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থন আহ্বান জানিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার জন্য জাতিসংঘের সহায়তা চেয়েছে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের স্পষ্ট বিরোধিতা এবং চীনের ধারাবাহিক সমালোচনা দেখায় যে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এশিয়ার কিছু দেশ এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে, এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো পরিষদের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর সমন্বিত অবস্থানের ওপর।
অন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জোর দিয়ে বলছেন যে ভেনেজুয়েলার স্বশাসন ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার মৌলিক ভিত্তি, এবং কোনো দেশই অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর জোরপূর্বক হস্তক্ষেপের অধিকার রাখে না। এই নীতি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হলে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়বে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এবং নিরাপত্তা পরিষদ উভয়ই ভেনেজুয়েলায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সকল পক্ষকে সংলাপের পথে ফিরে আসতে আহ্বান জানিয়েছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে, তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল, এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের পরিণতি আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।



