সিরডাপ মিলনায়তনে ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জাতীয় নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রযুক্তি হিংসা ও ঘৃণার বিস্তার ঘটাচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ বা ইচ্ছা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
সেমিনারটি “গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা” শীর্ষক ধারাবাহিকের অংশ হিসেবে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজন করে। আলোচনার বিষয় ছিল “ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ” এবং এতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ঢাকা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলিলী, বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, সিটি ব্যাংক পিএলসির অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট, উদ্যোক্তা আবিদা সুলতানা ও তাজমিন নাসরিন, এবং সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী। অনুষ্ঠানটি সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।
ড. ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, ডিজিটালাইজেশন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি এনেছে, তবে একই সঙ্গে নতুন ধরনের বৈষম্যও সৃষ্টি করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান গড়ে উঠলেও, ঐতিহ্যবাহী চাকরির বাজারে চাপ বাড়ছে। তিনি আগস্ট মাসে ঘটিত আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট কতটা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি, ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তকে তিনি নৈতিক পরাজয়ের একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
ভাট্টাচার্য আরও বলেন, এই নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা হিংসা ও ঘৃণার বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এই সমস্যার মোকাবিলায় কোনো কার্যকরী নীতি বা উদ্যোগ না গ্রহণ করে, তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার অব্যাহত থাকবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ণ করবে।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা ড. ভট্টাচার্যের মন্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে উল্লেখ করেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত ডিজিটাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করা, যাতে অনলাইন হিংসা ও ঘৃণামূলক বিষয়বস্তু দ্রুত সনাক্ত ও দমন করা যায়। তদুপরি, তারা ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যাতে ব্যবহারকারীরা অনলাইন কন্টেন্টের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকে।
ড. ভট্টাচার্যের বক্তব্যের পর সেমিনারটি প্রশ্নোত্তর পর্বে রূপান্তরিত হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল মিডিয়ার ভূমিকা, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। উপস্থিতদের মতে, ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন যদি ডিজিটাল হুমকির মোকাবিলায় সক্রিয় না হয়, তবে সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে গৃহীত হিংসা ও ঘৃণার ঘটনা বাড়তে পারে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
সেমিনারটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, ডিজিটাল যুগে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সিভিল সোসাইটি সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আরও গবেষণা ও নীতি প্রণয়নের জন্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ ও সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।



