ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ৫ জানুয়ারি টিভি টু-তে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ চালায়, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং ন্যাটোর অস্তিত্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই সতর্কবার্তা আসে ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘর্ষের পর, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ২০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণের কথা ঘোষণা করেন। ট্রাম্পের এই দাবি পূর্বে বহুবার প্রকাশ পেয়েছে; তিনি গ্রিনল্যান্ডকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস ফ্রেডেরিক নিলসেন উভয়েই তার কথার তীব্র সমালোচনা করেন। ফ্রেডেরিকসেন যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপকে ন্যাটোর মৌলিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে দেখেন এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলে সতর্ক করেন। নিলসেনও একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ডেনমার্কের দায়িত্ব, আর যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, কারণ ডেনমার্কের সামরিক সক্ষমতা সীমিত। তিনি ডেনমার্কের আর্কটিক অস্ত্রভাণ্ডারে কেবল “একটি কুকুরচালিত স্লেজ গাড়ি” যোগ হয়েছে বলে রসিকতা করেন। তবে ডেনিশ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই মন্তব্যকে অযৌক্তিক বলে খণ্ডন করেন এবং গ্রিনল্যান্ডের আশেপাশে রাশিয়া বা চীনের নৌবহর উপস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্পের দাবিকে অবাস্তব বলে উল্লেখ করেন।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিলসেন একটি সংবাদ সম্মেলনে জনগণকে শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতি গ্রিনল্যান্ডে প্রয়োগ করা যুক্তিযুক্ত নয় এবং রাতারাতি কোনো দেশ গ্রিনল্যান্ড দখল করবে—এমন আশঙ্কা অপ্রাসঙ্গিক। নিলসেনের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে ডেনমার্কের সরকারও গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
ট্রাম্পের “২০ দিন পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা হবে” মন্তব্যের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলে কূটনৈতিক কার্যক্রম বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ডেনমার্কের সরকার ইতিমধ্যে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ন্যাটোর শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনও এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি, তবে ন্যাটোর সামগ্রিক নীতি অনুসারে কোনো সদস্যের ওপর সরাসরি আক্রমণকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়।
এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে হস্তক্ষেপের ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়, তবে ন্যাটোর অভ্যন্তরে বিভাজন বাড়তে পারে এবং সামরিক জোটের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে, যা গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও জোরদার করছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেনের শেষ মন্তব্যে তিনি ন্যাটোর মৌলিক নীতি—সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান—কে পুনর্ব্যক্ত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই নীতি লঙ্ঘন না করার আহ্বান জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার উপর, এবং কোনো একক দেশের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ পুরো জোটকে দুর্বল করবে।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি এখন স্পষ্ট: স্বায়ত্তশাসন রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ন্যাটোর ঐক্য বজায় রাখা। ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই উত্তেজনা কিভাবে সমাধান হবে, তা পরবর্তী সপ্তাহে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।



