ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ সোমবার, ৫ জানুয়ারি, একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শ্বেতপত্র প্রকাশের বিষয় নিশ্চিত করেছে। এই নথিতে গত দেড় দশকে বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে দেখা দুর্নীতি, অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কাঠামোগত সমস্যার বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্বেতপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সরকার টেলিযোগাযোগ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনসেবার মানোন্নয়নের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি করতে চায়। এ ধরনের নথি নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত পরিকল্পনা গঠনে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শ্বেতপত্রের প্রস্তুতি ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনে গঠিত একটি টাস্কফোর্সের কাজের ফল। এই টাস্কফোর্সের মূল দায়িত্ব ছিল গত পনেরো বছরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতে সংঘটিত দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং তা ভিত্তিক শ্বেতপত্র রচনা করা।
টাস্কফোর্সের গঠন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক বছর কেটে যাওয়ার পর, শ্বেতপত্রের প্রকাশ মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নথি কেবল অতীতের ত্রুটি উন্মোচনই নয়, ভবিষ্যতে কীভাবে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা যায়, তা নিয়ে সুপারিশও প্রদান করে।
শ্বেতপত্রে উল্লেখিত সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব, সম্পদের অপচয়, অবৈধ সুবিধা প্রদান এবং কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা। এছাড়া, বিভাগীয় কাঠামোর অদক্ষতা, প্রযুক্তিগত আপডেটের ধীরগতি এবং গ্রাহক সেবার মানদণ্ডের নিম্ন স্তরকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই তথ্যগুলোকে ভিত্তি করে সরকার টেলিযোগাযোগ সেক্টরে নতুন নীতি প্রণয়ন, তদারকি প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে। বিশেষত, দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বতন্ত্র তদারকি ইউনিটের প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেমের ব্যবহার এবং কর্মচারীদের জন্য নৈতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শ্বেতপত্রের প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারকে নথির মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি সিরিজ কর্মশালা ও পরামর্শ সভার আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। এই সভাগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা, শিল্প প্রতিনিধিরা এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, শ্বেতপত্রের বিষয়বস্তু যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি সরকারকে দুর্নীতি মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার সরবরাহ করবে এবং টেলিযোগাযোগ খাতে জনসেবার মানোন্নয়নে সহায়তা করবে। তবে, একই সঙ্গে তারা সতর্ক করছেন যে নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত গ্যাপ থাকলে নথির প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।
শ্বেতপত্রে উল্লিখিত সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভাগীয় কাঠামোর পুনর্গঠন, স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহক অভিযোগের দ্রুত সমাধানের জন্য হটলাইন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সেবা গুণগত মান উন্নত করা এবং নাগরিকের আস্থা পুনর্গঠন করা লক্ষ্য।
সরকারের পরবর্তী ধাপ হিসেবে শ্বেতপত্রের সুপারিশগুলোকে আইনগত কাঠামোতে রূপান্তরিত করা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সংশোধন প্রস্তাব করা হবে। এছাড়া, টাস্কফোর্সের কাজের ফলাফলকে ভিত্তি করে একটি জাতীয় পর্যায়ের টেলিযোগাযোগ নীতি তৈরি করা পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা আগামী কয়েক বছরে বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শ্বেতপত্রের প্রকাশের ফলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এটি কেবল দুর্নীতি নির্মূলেই নয়, সেবা গুণগত মান ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার এই নথিকে ভিত্তি করে টেলিযোগাযোগ খাতে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ এবং জনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে।



