ইলা মিত্র, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও অনুবাদক, ১৯৫৪ সালে কারাবন্দি অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা গ্রহণের পর পরার্ডে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় গমন করেন। একই সময়ে তিনি ‘লেটারস ফ্রম প্রিজন’ শিরোনামের একটি বই প্রকাশের উদ্যোগ নেন, যা ১৯৫৫ সালে কলকাতার শ্যামচরণ দে স্ট্রিটে অবস্থিত নবভারতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি ছয়টি কবিতা সমন্বিত, মোট ৪৪ পৃষ্ঠা, এবং এক টাকা আট আনা মূল্যে চট্টগ্রামের ফারিঙ্গি বাজারের বইঘরে বিক্রি হয়।
প্রকাশনার সময় ইলা মিত্র মোট সাতটি বই অনুবাদ করেন, যার মধ্যে ‘হিরোশিমার কন্যা’ উল্লেখযোগ্য। ‘লেটারস ফ্রম প্রিজন’ বইয়ের কাভারে একটি পাখি খাঁচা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চিত্র রয়েছে, যা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। বইটির অনুবাদ কাজের দায়িত্বই ইলা মিত্রের, যাকে কমরেড ইলা-দি নামে সমাদৃত করা হয়।
বইটির বিষয়বস্তুতে আন্তর্জাতিক কবি ও লেখকদের রচনা অন্তর্ভুক্ত, যেমন ব্রিটিশ গায়ানার কবি মার্টিন কার্টার, আমেরিকান লেখক হাওয়ার্ড ফাস্ট, তুর্কি কবি নাজিম হিকমেট, এবং চিলির কবি পাব্লো নেরুডা। এই কবিতাগুলি মূলত কারাবন্দি ও দমনমূলক শাসনের বিরোধিতা করে, যা ইলা মিত্রের বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরে তিনি হাওয়ার্ড ফাস্টের নাটক ও উপন্যাসও পাঠ করেন, যা তার সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করে।
একজন পাঠক ১৯৫৮ সালে বাঙশাল এলাকায় বামপন্থী পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় এই বইটি প্রথমে হাতে নেন। তিনি স্মরণ করেন যে, বইয়ের কাভারটি দুই রঙের এবং হালকা রঙের চিত্রে পাখি খাঁচা থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেখায়। সেই সময়ের তরুণ পাঠক বইটির কবিতাগুলি তার কিশোর বয়সের সঙ্গে মিলে যায়, যা তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বইটির মূল কপি হারিয়ে যাওয়ার পর, পাঠক প্রথম আলো গ্রন্থাগারে একটি কাভারবিহীন কপি খুঁজে পান, যা তার স্মৃতির পুনর্জাগরণ ঘটায়। এই ঘটনা ইলা মিত্রের কাজের প্রতি অব্যাহত আগ্রহের প্রতিফলন।
ইলা মিত্রের মৃত্যু ২০০২ সালে ঘটে, তবে তার রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার আজও বাঙালি সমাজে প্রভাবশালী। ‘লেটারস ফ্রম প্রিজন’ প্রকাশনা তার সাহসিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইলা মিত্রের অনুবাদকর্মের পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের পাঠক তার কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে। প্রকাশক ও গবেষকরা ভবিষ্যতে এই বইটির পুনঃপ্রকাশের পরিকল্পনা করছেন, যাতে তার বামপন্থী আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রচার অব্যাহত থাকে।
বইটির বিক্রয় স্থান, মূল্য এবং প্রকাশকের তথ্য আজও ঐতিহাসিক নথি হিসেবে সংরক্ষিত, যা গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স সরবরাহ করে। ইলা মিত্রের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাহিত্যিক অবদান একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মুক্তির পথও গড়ে তোলেন।
এই প্রকাশনা ও অনুবাদ কাজের পুনরাবিষ্কার ইলা মিত্রের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে এবং বামপন্থী চিন্তাধারার ঐতিহ্যকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্মূল্যায়ন করতে সহায়তা করবে।



